চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) আঙিনায় এখন শুধুই বিষণ্ণতা। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে একই পুকুরে তিন শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো ক্যাম্পাস এখন চরম উদ্বেগ, বিষাদ এবং গভীর শোকের চাদরে ঢাকা। মেধাবী শিক্ষার্থীদের এই অকাল প্রয়াণে শোকাহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে বিরাজ করছে এক অপূরণীয় শূন্যতা। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণহানি রোধ করতে অত্যন্ত কঠোর ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে অবস্থিত সবকটি পুকুরকে বর্তমানে 'ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসের কোনো পুকুরে নামা, সাঁতার কাটা বা যেকোনো ধরনের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাই বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ক্যাম্পাসের সব পুকুরকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন থেকে কোনো শিক্ষার্থী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনোভাবেই পুকুরে নামতে পারবেন না বা পানির সংস্পর্শে যেতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই জরুরি নির্দেশনা অমান্য করে কেউ পুকুরে প্রবেশ করলে তা গুরুতর শৃঙ্খলাপরিপন্থি আচরণ হিসেবে গণ্য হবে। এই ধরনের নিয়মভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী কঠোরতম শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রশাসনের এই মানবিক ও জরুরি নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে আর কোনো প্রাণহানির হৃদয়বিদারক ঘটনা না ঘটে।

চুয়েট প্রশাসনের এই আকস্মিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে তিন শিক্ষার্থীর করুণ মৃত্যু। গত ২৮ জুলাই চুয়েটের কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল-সংলগ্ন পুকুরে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে প্রাণ হারান যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী অর্ণব সাহা। তার এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর শোকের আবহ তৈরি হয়। কিন্তু সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই, মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে গত বুধবার একই পুকুরে আরও দুই শিক্ষার্থী ডুবে মারা যান। তারা হলেন— কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের চমক দত্ত এবং তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের শান্ত দেব। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, উভয়েই ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থী ছিলেন, যাদের সামনে ছিল এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং অনেক স্বপ্ন।

একই পুকুরে ধারাবাহিকভাবে তিন শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু চুয়েট ক্যাম্পাসের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে একই স্থানে তিনটি প্রাণহানির ঘটনা এটিই প্রমাণ করেছে যে, এই পুকুরগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এখানে নামা জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই প্রশাসন নির্দিষ্ট কোনো একটি পুকুর নয়, বরং সামগ্রিক নিরাপত্তার স্বার্থে ক্যাম্পাসের সব পুকুরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তিতে পুনরায় জানানো হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। ফলে এখন থেকে চুয়েটের কোনো পুকুরেই শিক্ষার্থী বা অন্য কেউ নামতে পারবেন না। নির্দেশনা অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে বলে পুনরায় সতর্ক করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কঠিন সিদ্ধান্তকে শিক্ষার্থীদের জীবনের সুরক্ষা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।