বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগে বড় পরিবর্তন: এনটিআরসিএর সুপারিশ বন্ধের উদ্যোগ
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের বর্তমান পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে সরকার। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ প্রক্রিয়া বন্ধ করে পুনরায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা থেকে এই নতুন নিয়ম কার্যকর করার কথা রয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। গত ৩ আগস্ট সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এনটিআরসিএর সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনার লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভার কার্যবিবরণীতে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, এনটিআরসিএর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলিফ রুদা এবং মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, এনটিআরসিএর বর্তমান আইনগত কাঠামোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান জানান, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’-এর ক্ষমতাবলে প্রণীত ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়ন বিধিমালা, ২০০৬’ অনুযায়ী সংস্থাটির মূল দায়িত্ব হলো প্রার্থীদের যোগ্যতা নিরূপণ করে নিবন্ধন ও প্রত্যয়নপত্র প্রদান করা। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি পঞ্জিকা বর্ষে অন্তত একবার এই পরীক্ষা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
তবে আলোচনা সভায় উঠে আসে যে, ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত এনটিআরসিএ কেবল নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করত। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে সংস্থাটি সরাসরি নিয়োগের সুপারিশ দেওয়া শুরু করে। এই পরিবর্তনের ফলে শিক্ষা অঙ্গনে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে সভায় মত প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে নিয়োগ সুপারিশের পর অসংখ্য আইনি জটিলতা, মামলা-মোকদ্দমা এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই সংকট নিরসনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন প্রস্তাব করেন যে, এনটিআরসিএকে পুনরায় তার আদি রূপে ফিরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ, সংস্থাটি কেবল নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এরপর প্রত্যয়নপত্রপ্রাপ্ত যোগ্য শিক্ষকদের মধ্য থেকে নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি তাদের নিজস্ব বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগ প্রদান করবে। সভার উপস্থিত সকল কর্মকর্তা ও সদস্য এই প্রস্তাবের সাথে একমত পোষণ করেন বলে কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সভার সিদ্ধান্ত অংশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এখন থেকে এনটিআরসিএ কেবল নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজ করবে এবং ২০১৫ সালের পরিপত্রের আলোকে আর কোনো নিয়োগ সুপারিশ করবে না। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর বিষয়ে বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারা তাদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বউদ্যোগে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এই প্রক্রিয়াটি বৈধ করতে প্রয়োজনীয় পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন সংশোধন অথবা নতুন প্রজ্ঞাপন জারির কথা বলা হয়েছে।
যদিও সভার কার্যবিবরণীতে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে শিক্ষা অঙ্গনে এই সিদ্ধান্তটি এখন পর্যন্ত একটি প্রবল গুঞ্জন হিসেবেই রয়ে গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে সোমবার (১০ আগস্ট) এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের কাছে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। মন্ত্রী কেবল বলেন, "আজ ফল প্রকাশ করা হচ্ছে। এই বিষয়ে (এনটিআরসিএর নিয়োগ) পরবর্তীতে কনফারেন্স করা হবে, সেদিন আপনারা প্রশ্নের উত্তর পাবেন।" এভাবে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। অন্যদিকে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেককেও বিষয়টি নিশ্চিত করতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
উল্লেখ্য যে, ২০০৫ সালে এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠার পর প্রথম এক দশক ধরে সংস্থাটি মূলত শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা এবং সনদ প্রদানের কাজ করত। এরপর ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুপারিশ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি। সে সময় এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো হয়েছিল, কারণ এর ফলে ঘুষ ও অনিয়মমুক্ত স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এই সুপারিশ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭১ জন শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন।











