ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন প্রবল জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। দলটির আগে ঘোষিত মেয়র প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের পরিবর্তে এবার দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। এনসিপির উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রার্থী পরিবর্তনের এই পুরো বিষয়টি মূলত নির্ভর করছে এনসিপি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর। বিশেষ করে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে প্রার্থী সমন্বয়ের বিষয়ে যদি কোনো চূড়ান্ত সমাধান না আসে, তবে ঢাকা উত্তরে ঘোষিত প্রার্থী পরিবর্তনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব পেতে পারে। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে সামনে আনার বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা চলছে, যদিও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত এনসিপির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আরিফুল ইসলাম আদীবই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলটির ঘোষিত মেয়র প্রার্থী হিসেবে বহাল রয়েছেন।

উল্লেখ্য যে, গত ২৯ মার্চ ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি। সেই ঘোষণার সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আরিফুল ইসলাম আদীব এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়। তবে পরবর্তীতে জোটের সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন ও জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে মেয়র প্রার্থী করার সিদ্ধান্তটি এনসিপির ঘোষিত প্রার্থী আসিফ মাহমুদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক পরিস্থিতি তৈরি করে। একই রাজনৈতিক জোটের অংশ হয়েও রাজধানীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিটিতে দুই দলের আলাদা প্রার্থী থাকায় জোটের সামগ্রিক নির্বাচনি কৌশল এবং ঐক্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দুই দলের মধ্যে এখনো পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো প্রার্থী সমন্বয় সম্পন্ন হয়নি। ফলে ঢাকার দুই সিটের প্রার্থী তালিকায় শেষ পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে।

এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রকৃতপক্ষে, ঢাকার সিটি নির্বাচন নিয়ে এনসিপির প্রাথমিক প্রস্তুতির সময় থেকেই পাটওয়ারীর নাম একজন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচিত ছিল। দলীয় পর্যায়ে প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়ায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় সিটের জন্য একাধিক প্রভাবশালী নেতার নাম বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল এবং সেই তালিকায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নামও গুরুত্বের সাথে ছিল। তবে পরবর্তীতে দলীয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে ঢাকা উত্তরে আরিফুল ইসলাম আদীব এবং দক্ষিণে আসিফ মাহমুদকে প্রার্থী করা হয়, যার ফলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম তখন চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল। এখন জোটের সমীকরণে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সেই পুরোনো নামই পুনরায় সামনে এসেছে। এছাড়া নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সম্ভাব্য প্রার্থিতার আলোচনায় তার পূর্ববর্তী নির্বাচনি প্রস্তুতিগুলোও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক পর্যায়ে তাকে ঢাকা-১৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর পাটওয়ারী ঢাকা-৮ আসনে প্রার্থী হন। অন্যদিকে, ঢাকা-১৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। ফলে জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১৮ কেন্দ্রিক যে ব্যাপক সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতির সঙ্গে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম যুক্ত ছিল, এবার সেই একই নির্বাচনি এলাকার অন্তর্ভুক্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে তাকে মেয়র প্রার্থী করার আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

এনসিপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা জানান, দলের আহ্বায়ক এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা হিসেবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দলের অভ্যন্তরে এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক মহলে বেশ পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য। যেকোনো জাতীয় সংকট এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তাকে সবসময় রাজপথে সোচ্চার এবং সক্রিয় থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং গণ-অভ্যুত্থানের সময় মাঠপর্যায়ে তার সক্রিয়, সাহসী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। তরুণ প্রজন্মের এই প্রতিনিধি নিজের জনসম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সাধারণ ভোটারদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই কারণেই আদীবের পরিবর্তে পাটওয়ারীকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, এর পেছনে মূলত জোটের নির্বাচনি সমীকরণ বড় ভূমিকা রাখছে। এনসিপি যদি জামায়াতের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী সমন্বয়ের বিষয়ে কোনো ঐক্যমতে পৌঁছাতে না পারে, তবে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে নিজেদের নির্বাচনি কৌশল নতুন করে পুনর্বিন্যাস করতে পারে দলটি। এ ক্ষেত্রে ঢাকা উত্তর সিটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে এবং বিজয় নিশ্চিত করতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, আরিফুল ইসলাম আদীব এনসিপির একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নেতা। তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হওয়ার পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে মহানগর উত্তরের দলীয় কার্যক্রমের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকায় তার একটি শক্তিশালী নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। ফলে তার পরিবর্তে পাটওয়ারীকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটি কেবল একজন প্রার্থীর পরিবর্তন হিসেবে গণ্য হবে না, বরং এর মধ্য দিয়ে এনসিপির সামগ্রিক নির্বাচনি কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের বার্তাও চলে যেতে পারে। তবে পুরো বিষয়টির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যকার নির্বাচনি সমীকরণ। জাতীয় রাজনীতিতে দুই দল বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে নির্বাচন করার কথা ভাবছে দল দুটি। যদি ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ এবং সাদিক কায়েমের প্রার্থিতা বহাল থাকে, তবে দুই দলের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনিবার্য। আর সেই পরিস্থিতিতে ঢাকা উত্তরেও এনসিপি তাদের প্রার্থীকে আরও শক্তিশালী করার কৌশল নিতে পারে, যার ফলে নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারীর নাম বিবেচনায় এসেছে।

তবে এর বিপরীত চিত্রও বিদ্যমান। যদি শেষ মুহূর্তে জোটের মধ্যে কোনো ধরনের কার্যকর নির্বাচনি সমঝোতা হয়, তবে ঢাকার দুই সিটির প্রার্থী তালিকা নতুন করে পর্যালোচনা করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে কোথায় কোন দল প্রার্থী দেবে এবং কোথায় কে কাকে সমর্থন করবে, সেটিই হয়ে উঠবে মূল সিদ্ধান্তের বিষয়। এনসিপির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় তাই এখন দুটি সমান্তরাল বিষয় চলছে—একদিকে ঘোষিত প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচনি প্রস্তুতি, অন্যদিকে সম্ভাব্য জোট সমঝোতার জন্য বিকল্প রাজনৈতিক হিসাব। এই কারণেই নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নামকে আপাতত একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই মুহূর্তে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর প্রার্থিতা নিশ্চিত করে দেওয়ার মতো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দলের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি। এনসিপির ঘোষিত তালিকায় এখনো ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র প্রার্থী হিসেবে আরিফুল ইসলাম আদীবের নামই রয়েছে। দলটির সূত্র অনুযায়ী, জোটের সমঝোতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার পরই এ বিষয়ে দলের চূড়ান্ত অবস্থান পরিষ্কার হবে। অর্থাৎ, পাটওয়ারীর প্রার্থিতা কেবল ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক বিবেচনার ওপর নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণের সাথে যুক্ত।

গত বুধবার (১২ আগস্ট) এনসিপির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য এবং দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের জন্য আমাদের যে প্রার্থী আগে ঘোষিত করা হয়েছে, এখন পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তই বহাল আছে। যদি ভবিষ্যতে কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়, তবে আমরা তা আপনাদের জানিয়ে দেব।” ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, “আমি মনে করি নির্বাচন হতে এখনো যথেষ্ট সময় বাকি আছে। এই সময়ে একটি সমঝোতা বা জোট হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে জোটের পক্ষ থেকে একজন একক প্রার্থী থাকার সম্ভাবনা বেশি।” এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এনসিপির ঘোষিত মেয়রপ্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীব রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “সিটি করপোরেশন নির্বাচন হতে এখনো অনেক দেরি। আমি আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি। এখন পর্যন্ত প্রার্থী পরিবর্তন নিয়ে এমন কোনো আলোচনা আমার সাথে হয়নি।” তবে এই পুরো বিষয়ে জানতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।