চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজের বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে প্রাণ হারালেন আট শ্রমিক। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারি ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকায় অবস্থিত 'ফেরদৌস স্টিল' নামক কারখানায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক ইশতিয়াক রহমান জানান, ওই কারখানা থেকে দুই দফায় সাতজনকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে ছয়জনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল, যাদের মরদেহ বর্তমানে হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। অপর একজনকে নিবিড় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সীতাকুণ্ড থানার তদন্ত পরিদর্শক মো. আলমগীর নিশ্চিত করেছেন যে, এই ঘটনায় মোট আটজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ছয়জনের মরদেহ রাখা থাকলেও ঘটনাস্থল থেকে আরও দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।
মৃত আট শ্রমিকের মধ্যে চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন—সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। নিহতরা সবাই স্থানীয় ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় জেলেরা জানান, শুক্রবার সকালে কারখানাটির ভেতর থেকে তীব্র গ্যাস নির্গত হতে দেখা যায়। গ্যাসের গন্ধ এতই তীব্র ছিল যে, সাগরে ইলিশ ধরতে যাওয়া জেলেরা কারখানার পাশের খালে প্রবেশ করতে পারেননি। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তাদের অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে নৌকগুলো ঘাটে ভেড়াতে হয়।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে শ্রমিকদের আর্তনাদ ও চিৎকার শোনা যায়। তারা দ্রুত কারখানা এলাকায় গিয়ে দেখেন, অসুস্থ বেশ কিছু মানুষকে গাড়িতে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। এরপর জাহাজের ভেতরে বেশ কয়েকজন শ্রমিকের নিথর দেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তারা কারখানার ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। পরবর্তীতে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এই বিষয়ে কারখানার মালিক মো. মহিউদ্দিন মুঠোফোনে জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি কারখানার বাইরে ছিলেন। কারখানা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানান, জাহাজে কর্মরত ছয় থেকে আটজন কর্মী অসতর্কতাবশত বিষাক্ত গ্যাসের কবলে পড়েছেন। তার ধারণা, চার থেকে পাঁচজন মারা গেছেন এবং তিনজনের মতো আহত হয়েছেন। তিনি জানান, কারখানায় পৌঁছানোর পর বিস্তারিত জানাবেন।
অন্যদিকে, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যান ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল, সেটি ছিল একটি এলএনজি বহনকারী জাহাজ। নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করতে হয়। কারণ এসব জাহাজের ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস থাকতে পারে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করেই কাটার কাজ শুরু করায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত দুর্বল।










