শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একটি মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানের এডহক কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক থেকে শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা উত্তোলন করেছেন ওই ভারপ্রাপ্ত সুপার। অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম আব্দুল মান্নান, যিনি সখিপুর সোলায়মানিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সম্প্রতি এই গুরুতর অভিযোগ সামনে এনেছেন মাদ্রাসাটির এডহক কমিটির সভাপতি জুয়েল আকরাম রিপন। তিনি এই জালিয়াতির বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক হিসেবে অস্বচ্ছতা চলে আসছিল। ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকেই ভারপ্রাপ্ত সুপার আব্দুল মান্নান মাদ্রাসার আয়-ব্যয়ের হিসাব কমিটির কাছে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন না। অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে হিসাব প্রদান থেকে বিরত থাকেন এবং বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
আর্থিক অনিয়মের সন্দেহ হওয়ায় ২০২৫ সালে এডহক কমিটির সভাপতি জুয়েল আকরাম রিপন একটি তদন্ত ও অডিট কমিটি গঠন করেন। উক্ত কমিটিতে সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান মাদ্রাসার সহকারী গ্রন্থাগারিক খালিদ বিন সাঈদ, সহকারী শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম এবং সহকারী মৌলভী আব্দুল আজিজ। তদন্ত কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তিন কার্যদিবসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য। তবে ভারপ্রাপ্ত সুপার আব্দুল মান্নান হিসাব জমা দিতে এক মাসের সময় চেয়ে নেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এক মাস সময় চাওয়া হলেও দীর্ঘ এক বছর পার হয়ে গেলেও তিনি অডিট কমিটির কাছে প্রয়োজনীয় হিসাব ও নথিপত্র পেশ করতে পারেননি।
হিসাব প্রদানে এই চরম গাফিলতির প্রেক্ষিতে সভাপতি জুয়েল আকরাম রিপন সিদ্ধান্ত নেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব পাওয়া না যাচ্ছে, ততক্ষণ তিনি কোনো দাপ্তরিক কাগজে স্বাক্ষর করবেন না। কিন্তু এর মধ্যেই ঘটে এক অভাবনীয় ঘটনা। গত ২০ আগস্ট অগ্রণী ব্যাংকের শরীয়তপুর শাখার ০২০০০০১৪০০৯২৯ নম্বর হিসাব থেকে সভাপতি জুয়েল আকরাম রিপনের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ৩ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৪ টাকা উত্তোলন করেন ভারপ্রাপ্ত সুপার আব্দুল মান্নান। ব্যাংক নথিতে এই টাকা উত্তোলন করা হয়েছিল ২০২৬ সালের জুলাই মাসের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাবদ। টাকা উত্তোলনের পর ভারপ্রাপ্ত সুপার সেই অর্থ নিজের এবং অন্যান্যদের মধ্যে বণ্টন করে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
প্রাথমিকভাবে স্বাক্ষর জালিয়াতির কথা অস্বীকার করলেও, অগ্রণী ব্যাংকের from-টাকা উত্তোলনের অকাট্য প্রমাণ দেখানো হলে আব্দুল মান্নান টাকা উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেন। এই ঘটনার পর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সংবাদকর্মীরা যখন মাদ্রাসায় উপস্থিত হন, তখন শিক্ষক, কর্মচারী, অভিভাবক ও স্থানীয়রা ভিড় করে ভারপ্রাপ্ত সুপার আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন অনিয়মের কথা প্রকাশ করেন।
মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক টিউলিজ রহমান অভিযোগ করে বলেন, “সুপার আব্দুল মান্নান শিক্ষক ও কর্মচারীদের সাথে সবসময় অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেন। তিনি নিয়মিত মাদ্রাসায় উপস্থিত থাকেন না। মাঝেমধ্যেই বেতন নিয়ে ঝামেলা করেন। আমাদের অ্যাকাউন্টে বেতন ঢুকছে না কেন—এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন, সভাপতি স্বাক্ষর দিচ্ছেন না বলে বেতন পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু পরে জানতে পারি, তিনি সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে টাকা তুলে নিজের অ্যাকাউন্টে রেখে দিয়েছিলেন এবং বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে আমাদের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেছেন। এই ধরনের অপকর্মের জন্য আমরা তার কঠোর বিচার দাবি করছি।”
অডিট কমিটির সদস্য ও সহকারী গ্রন্থাগারিক খালিদ বিন সাঈদ জানান, গত বছর সভাপতি তাকেসহ তিন সদস্যের অডিট কমিটি গঠন করার পর তারা সুপারের কাছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট চেয়েছিলেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি এবং অবকাঠামো নির্মাণকাজের ব্যয়ের হিসাব চাওয়া হলেও তিনি এক বছর ধরে তা দিতে পারেননি। প্রাথমিক তদন্তে আয়-ব্যয়ের হিসেবে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান। কিছু জটিলতার কারণে রিপোর্ট দাখিল করতে দেরি হলেও দ্রুতই তা সভাপতির কাছে জমা দেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
একই কথা echoed করেছেন অডিট কমিটির অন্য সদস্য সহকারী শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম এবং সহকারী মৌলভী আব্দুল আজিজ। তারা বলেন, তিন কার্যদিবসের সময়সীমা থাকলেও সুপার এক মাস সময় চেয়ে নিয়ে এক বছর পার করে দিয়েছেন। আজ দিচ্ছি, কাল দিচ্ছি বলে তিনি প্রতিনিয়ত কমিটিকে এড়িয়ে চলেছেন। একজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছ থেকে এমন প্রতারণামূলক আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক বলে তারা মন্তব্য করেন। আগামী সপ্তাহের মধ্যে তারা প্রাপ্ত নথিপত্রসহ অডিট রিপোর্ট সভাপতির কাছে পেশ করবেন বলে জানান।
এডহক কমিটির সভাপতি জুয়েল আকরাম রিপন বলেন, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার কাছে হিসাব চেয়েছি, কিন্তু তিনি নানান অজুহাতে তা এড়িয়ে গেছেন। তাই আমি স্বাক্ষর দেওয়া বন্ধ করে দিই। এরপর জানতে পারি তিনি আমার স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক থেকে ৩ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৪ টাকা তুলেছেন। প্রথমে অস্বীকার করলেও ব্যাংকের প্রমাণ দেখে তিনি তা স্বীকার করেন। আমাকে না জানিয়ে আমার স্বাক্ষর ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এটি একটি পরিকল্পিত জালিয়াতি। আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সখিপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি এবং ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি।”
পুরো ঘটনার বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত সুপার আব্দুল মান্নানের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি সাংবাদিকদের কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকার করেন। তবে তিনি জানান, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তার বক্তব্য পেশ করবেন। তবে সভাপতির স্বাক্ষর জাল করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে উত্তর দেন, “কাজের প্রয়োজনে যেকোনো মানুষের স্বাক্ষর জাল করা যায়, এটা কোনো বিষয় না। কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে এটা বেআইনি, তবে আমার বিচার করবে।”
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোফাজ্জল হুসাইন জানান, সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে, ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, “কারো স্বাক্ষর জাল করে টাকা উত্তোলন করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। সভাপতির অভিযোগপত্র পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট পাঠানো হবে।”




















