ভারতে প্রচলিত একটি কথা আছে— ‘ভয়ের পরেই জয়’। কিন্তু পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গল্পটা সম্ভবত ভিন্ন; সেখানে ভয়ের পর জয়ের বদলে দেখা যায় ‘বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর জিপ’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) সম্প্রতি প্রকাশিত এক পাকিস্তানি তরুণীর ভিডিওতে উচ্চারিত এই কথাগুলো দেশটির বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির এক রূঢ় ও কঠিন চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। ভিডিওটির ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান পাকিস্তানে রাষ্ট্রের সমালোচনা করা বা ভিন্নমত প্রকাশের সামান্যতম চেষ্টা করলেও তা কঠোর দমন-পীড়নের মুখে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রতিবাদী কণ্ঠগুলো রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভিন্নমত দমনের এই চরম প্রবণতার সবচেয়ে বড় মূল্য দীর্ঘকাল ধরে দিচ্ছে বেলুচিস্তান অঞ্চল। সেখানে অসংখ্য তরুণের গুম হওয়ার অভিযোগ রয়েছে যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি জোরপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ডা. মাহরাং বেলুচকে কোয়েটার একটি সন্ত্রাসবিরোধী আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন, যা অধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করছে। তবে অভিজ্ঞ বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটটি কেবল কাশ্মীরের আঞ্চলিক সমস্যা নয়; বরং এটি পাকিস্তানের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এক গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য ফুটে উঠেছে— রক্তাক্ত সড়ক, গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারী, নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে দিশেহারা পরিবার এবং নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের মুখোমুখি সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী। সমালোচকরা বলছেন, এসব দৃশ্য পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সেই আন্তর্জাতিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক, যেখানে ইসলামাবাদ নিজেকে জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রধান রক্ষাকারী হিসেবে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করে। যদিও সহিংসতায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের পরস্পরবিরোধী দাবি রয়েছে, তবে দমন-পীড়ন যে ব্যাপক ও পরিকল্পিত আকার ধারণ করেছে, সে বিষয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে তেমন কোনো দ্বিমত নেই।
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি), যা মূলত বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের একটি সমন্বিত জোট। পাকিস্তান সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের দোহাই দিয়ে এই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে এই সংগঠনের নেতৃত্বে তীব্র বিক্ষোভ চলছে। একই সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক কারচুপি, সহিংসতা এবং বর্জনের অভিযোগ উঠেছে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখনও কারাগারে বন্দি রয়েছেন এবং তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এই নির্বাচন বর্জন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান এই সংকট কেবল একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। এখানে মূল প্রশ্নটি হলো— পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিকরা কি রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত না হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানানোর বা প্রতিবাদ করার অধিকার রাখেন?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে— বেলুচিস্তানের পর পাকিস্তান কি আরেকটি সংবেদনশীল অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা মোকাবিলার ঝুঁকি নিতে পারবে? পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একটি তীব্র অভিযোগ জোরালোভাবে উঠছে। তাদের দাবি, ভারতে তরুণদের বিভিন্ন আন্দোলনের দৃশ্য পাকিস্তানের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করলেও, মিরপুর ও রাওয়ালকোটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের খবর দেশটির মূলধারার গণমাধ্যমে প্রায় সম্পূর্ণভাবে আড়াল করা হয়েছে। এই চরম বৈপরীত্য দেশটির সচেতন তরুণ সমাজের নজর এড়ায়নি। পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের একটি বিতর্কিত মন্তব্য। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি বলেন, পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের আন্দোলনকারীদের তিনি ‘ভারতের মতোই শত্রু’ হিসেবে দেখেন। তার এই মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্র যখন নিজের দেশের নাগরিকদেরই বহিরাগত শত্রুর দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে, তখন গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি এবং নাগরিক অধিকার সম্পূর্ণ প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে ১২টি সংরক্ষিত আসন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। পাকিস্তান সরকার আজাদ জম্মু ও কাশ্মির আইনসভায় ১২টি আসন সংরক্ষণ করে, যেগুলো কয়েক দশক আগে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে চলে আসা শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয় এবং ধারাবাহিক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। জেএএসি-র দাবি, তাদের উদ্দেশ্য কেবল নির্বাচনে অংশ নেওয়া নয়; বরং ওই অঞ্চলের বর্তমান বাসিন্দাদের প্রকৃত সম্মতি ও স্বার্থের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। কিন্তু সংলাপের পথ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে ইসলামাবাদ দমননীতির পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ। সমালোচকরা বলছেন, সরকার জেএএসি-কে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে। রাওয়ালকোট থেকে আসা বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি চালিয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্যানুযায়ী, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই সহিংসতায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং ছয়জন পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য। তবে সব বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল কি না অথবা নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিটি পদক্ষেপ যৌক্তিক ছিল কি না— তা একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক এই সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি শুধু হতাহতের ঘটনাই নয়, বরং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় একটি নাগরিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, কোনো নাগরিক সংগঠনকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সীমিত করা মৌলিক স্বাধীনতার জন্য একটি গুরুতর হুমকি। এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুতর ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘমেয়াদী মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা। খবরে বলা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে পুরো এলাকা যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এমনকি পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিও এত দীর্ঘ সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা কোনো লক্ষ্যভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়; বরং এটি এক ধরনের ‘সমষ্টিগত শাস্তি’র ধারণা সৃষ্টি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাওয়ালকোট এখন আর কেবল একটি শহরের নাম নয়; এটি পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষেত্রে ইসলামাবাদের ধৈর্যের এবং গণতান্ত্রিক অবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে বিচার করা হয় সরকার-সমর্থকদের সঙ্গে তার আচরণের মাধ্যমে নয়; বরং যারা শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের সমালোচনা করে, তাদের প্রতি রাষ্ট্র কী ধরনের আচরণ করে— তা দিয়েই প্রকৃত গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয়। সূত্র: এনডিটিভি











