মিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরে বুধবার আকস্মিক ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে এক নতুন ও উদ্বেগজনক মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই হামলার ফলে চলমান আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার প্রবল ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার মাধ্যমে ইরান পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি কঠোর বার্তা দিতে চেয়েছে যে, সংঘাত বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত ভৌগোলিক অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত এই হামলার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ স্বীকার করেনি এবং এতে কোনো হতাহতের খবরও পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ সহযোগী গবেষক এইচ.এ. হেলিয়ার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই হামলাটি সরাসরি ইরানের পক্ষ থেকে না হয়ে তেহরান-সমর্থিত কোনো আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমেও পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, “এর মাধ্যমে ইরান বিশ্ব সম্প্রদায়কে এটি বোঝাতে চাইছে যে, নিজেদের জাতীয় সীমান্তের অনেক বাইরেও নিখুঁতভাবে আঘাত হানার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।” হেলিয়ার আরও উল্লেখ করেন যে, তেহরান সম্ভবত এটি দেখাতে চায় যে, প্রয়োজন হলে তারা তাদের মিত্র জোট ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের অন্য সদস্য দেশ ও গোষ্ঠীদের ব্যবহার করেও সংঘাতকে নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম।
হামলাটি ঘটে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে পণ্য খালাস কার্যক্রম চলাকালীন। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রে জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী এবং যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন ও পরিচালিত একটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ স্থাপনায় এই ড্রোন হামলা চালানো হয়। শিল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ওই জাহাজটির নাম ‘এনারগোস উইন্টার’। সন্দেহভাজন ড্রোন হামলার ফলে সেখানে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়, যা দ্রুত পার্শ্ববর্তী আরেকটি জাহাজেও ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রথমবারের মতো মিসর সরাসরি হামলার শিকার হলো। চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল শিবিরের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে পরিচালিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় মধ্যস্থতাকারীদের অন্যতম প্রধান দেশ ছিল কায়রো। যুদ্ধ চলাকালীন মিসর একদিকে যেমন উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি যুদ্ধ বন্ধ করার জোরালো আহ্বানও জানিয়েছে। তবে বিশ্লেষক হেলিয়ারের মতে, কায়রো কৌশলগতভাবে কোনো পক্ষের সঙ্গেই সরাসরি নিজেকে সম্পৃক্ত করেনি। তার ভাষায়, “যদি সত্যিই এই হামলাটি ইরানের পক্ষ থেকে পাঠানো কোনো বার্তা হয়ে থাকে, তবে মিসরকে নিরপেক্ষ অবস্থানে রাখার ক্ষেত্রে এটি খুব একটা ইতিবাচক সংকেত নয়।”
তবে এই হামলার পর মিসরের পক্ষ থেকে কোনো পাল্টা সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানোর সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। হেলিয়ার বলেন, “আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে মিসর বরাবরই অত্যন্ত সতর্ক এবং রক্ষণশীল নীতি অনুসরণ করে থাকে।”
ইরান ও মিসরের সম্পর্কের ইতিহাস বেশ জটিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। এরপর দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তেহরান ও কায়রোর মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত শীতল ছিল, যা আরব বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘতম কূটনৈতিক দূরত্বের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের উত্তেজনার মাঝে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক সংলাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মিসরের বন্দরে এই রহস্যময় ড্রোন হামলার ঘটনায় এখনো কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার না করায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। ফলে হামলার নেপথ্যে প্রকৃত কারিগর কারা, তা নিশ্চিত হতে বিস্তারিত তদন্ত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। সূত্র: সিএনএন











