জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্ক সফরে গিয়ে প্রথম দিনেই অত্যন্ত সক্রিয় ও ফলপ্রসূ কর্মসূচি পালন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নির্ধারিত ১২টি কর্মসূচির মধ্যে ১০টিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে জোরালো বার্তা প্রদান করেছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এই বিস্তারিত তথ্যসমূহ জানান।
ড. মাহদী আমিন জানান, সফরের প্রথম দিনের কার্যক্রম শুরু হয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী ও প্লেনারি অধিবেশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। এই মুহূর্তটিকে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করে ড. মাহদী আমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। একই সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন, যা বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং গৌরবের বিষয়।’
সফরের প্রথম দিনে আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা মাথায় রেখে প্রধানমন্ত্রী ভুটানের প্রধানমন্ত্রী এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এই দ্বিপক্ষীয় আলোচনাগুলোতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপন, পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সমন্বয় এবং সার্ক (SAARC) অঞ্চলের সামগ্রিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আঞ্চলিক বৈঠকের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রসারে প্রধানমন্ত্রী হাইতির প্রধানমন্ত্রী এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে দেশটির বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে গভীর আলোচনা হয়। বিশেষ করে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং এই অভিজ্ঞতার আলোকে হাইতি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে উপকৃত হতে পারে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সুচিন্তিত মতামত প্রদান করেন।
অন্যদিকে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকটিকে অত্যন্ত গঠনমূলক, আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ড. মাহদী আমিন। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তাঁর নির্বাচনী বিজয় এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে তুরস্ক সফরের জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণও জানান। বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক এবং ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়।
মানবিক সংকট নিরসনে এবং রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানে প্রথম দিনেই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর (UNHCR) এবং মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের সঙ্গে বৈঠকে ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। এ লক্ষ্যে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি এবং দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উদ্যোগগুলোকে আরও জোরদার করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রসার, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং বাজেট প্রণয়নসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালার বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বিশ্বব্যাংকের আরও বড় ভূমিকা পালন এবং ভবিষ্যতে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত পোষণ করা হয়।
ড. মাহদী আমিন আরও জানান, সময়সূচির সীমাবদ্ধতার কারণে নির্ধারিত ১২টি কর্মসূচির মধ্যে ১০টিতে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি অংশ নিতে পেরেছেন। বাকি কর্মসূচিগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। এর মধ্যে মেটা (Meta)-র সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দুই পক্ষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়। তিনি podkreপ করেন যে, প্রথম দিনের প্রতিটি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং সাধারণ জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা ও সম্মান সমুন্নত রাখার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ড. মাহদী আমিনের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ (সালেহ শিবলী) এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমন।
















