জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কারের মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা উচিত ছিল বলে মনে করেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে অবস্থিত বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে ১১ দলের এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। বৈঠকে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

নাহিদ ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জুলাই সনদ প্রণয়নের সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন সর্বজনগ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য একটি নতুন ও কার্যকর পদ্ধতির প্রস্তাব করা হয়েছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শুধুমাত্র নির্বাচন পদ্ধতি নয়, বরং রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও জুলাই সনদে গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে কীভাবে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা যায়, সে বিষয়েও সেখানে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ছিল।

১১ দলের প্রত্যাশা ছিল, জাতীয় নির্বাচনের পর গণভোটে প্রাপ্ত ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। এরপর একটি সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হবে এবং সেই সংস্কারকৃত সংবিধানের অধীনেই নতুনভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হবে। তবে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন যে, বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তিনি দাবি করেন, সরকার গণভোটের রায় এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ হয়নি এবং প্রয়োজনীয় অধিবেশনও ডাকা হয়নি। একই সাথে তিনি অভিযোগ করেন যে, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা হচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশনকেও সেই দলীয়করণের আওতায় আনা হয়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ।

বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই ১১ দল তাকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে জুলাই সনদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাকে আরও ছয় মাস পদে রাখা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতিকে কোনো ধরনের বিচারের আওতায় না এনে কেন ‘ফ্রি এক্সিট’ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে? তার মেয়াদ কেন বাড়ানো হলো এবং এর পেছনে কোনো গভীর রাজনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা, বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন নাহিদ ইসলাম। বর্তমান সিদ্ধান্তের ফলে এ বিষয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। পাশাপাশি বিএনপির অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতার পালাবদলের সময় বিএনপি বিভিন্ন সময়ে নিজেদের হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছে, যার ফলে দেশে বারবার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১ দলের পক্ষ থেকে একজন অভিন্ন প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি ঘোষণা করেন, ১১ দল ঐক্যবদ্ধভাবে এই নির্বাচনে অংশ নেবে এবং তাদের প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। নাহিদ ইসলাম বলেন, কর্নেল অলি আহমদ একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকটের সময়ে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে ১১ দল তাকে সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করছে। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশের চলমান সংকট নিরসনের পথ প্রশস্ত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।