অন্তর্বর্তী সরকারের সম্প্রতি গৃহীত ‘Essential Drugs List-2026’ এবং ‘Drug Price Determination Method-2026’ বাতিলের সিদ্ধান্তকে তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে জনস্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির দাবি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং আইনি সীমাবদ্ধতার দোহাই দিয়ে এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো বহুজাতিক এবং প্রভাবশালী দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা। অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা না হলে দেশব্যাপী সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এক ব্যাপক ও শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তোলার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে দলটি।

সোমবার এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব আখতার হোসেন এক যৌথ বিবৃতিতে এই সতর্কবার্তা প্রদান করেন। বিবৃতিতে বিস্তারিতভাবে জানানো হয় যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় মাত্র ১১৭টি ওষুধের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। এনসিপির দাবি, ওই তালিকার প্রায় ৪০ শতাংশ ওষুধ বাস্তবে চিকিৎসায় অকার্যকর হয়ে পড়েছিল, যা রোগীদের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনছিল না। এই সংকট দূর করতে এবং স্বাস্থ্যসেবাকে আরও জনবান্ধব করতে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের উদ্যোগ নেয় এবং ওষুধের তালিকাটি সম্প্রসারণ করে ২৯৫টিতে উন্নীত করে। একই সঙ্গে এসব ওষুধের ওপর কঠোর মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা হয়। এনসিপির মতে, এই ২৯৫টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম ছিল।

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, পূর্ববর্তী নীতি অনুযায়ী প্রতিটি ওষুধ কোম্পানির জন্য তাদের মোট বার্ষিক বিক্রয়ের অন্তত ২৫ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক ছিল। এই শর্ত পালনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর নতুন ওষুধের অনুমোদন বন্ধ করে দেওয়ার বিধানও ছিল। তবে এনসিপির অভিযোগ, বাণিজ্যিক জেনেরিক ওষুধ বিক্রি করে অধিক মুনাফা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে কিছু প্রভাবশালী ওষুধ কোম্পানি এই বাধ্যতামূলক উৎপাদন শর্তটি শিথিল করতে চেয়েছিল। বর্তমান সরকার ওই কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সম্প্রসারিত তালিকাটি বাতিল করে পুনরায় ১১৭টি ওষুধের পুরোনো তালিকায় ফিরে গেছে এবং ওষুধের মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে বলে দাবি করেছে দলটি।

এনসিপি সতর্ক করে বলেছে, মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ওপর থেকে সরকারি মূল্যনিয়ন্ত্রণ তুলে নিলে সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে অনেক বেশি দামে ওষুধ কিনতে হবে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ক্যানসার, অ্যাজমা এবং কিডনি রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীরা এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের একটি বিশাল অংশ সাধারণ মানুষকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়, যার মধ্যে ওষুধের পেছনে ব্যয়ের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। ফলে ওষুধের দাম বৃদ্ধি পেলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর চিকিৎসাব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।

দলটি আরও অভিযোগ করেছে যে, ২০২৬ সালের আধুনিক সংস্কারগুলো বাতিল করে সরকার মূলত ১৯৯৪ সালের সেকেলে ব্যবস্থায় ফিরে গেছে। তাদের দাবি, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে চিকিৎসাব্যবস্থা এবং রোগের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে, তাই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নিয়মিতভাবে হালনাগাদ করা অত্যন্ত জরুরি। বিবৃতিতে আহ্বান জানানো হয়েছে যে, ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতির জনমুখী চেতনাকে ধারণ করে বর্তমান সময়ের রোগ ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও জনবান্ধব জাতীয় ওষুধনীতি দ্রুত প্রণয়ন করতে হবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— ‘Essential Drugs List-2026’ বাতিলের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করা, ২৯৫টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের জন্য কার্যকর মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও জনমুখী জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়ন করা।