বিশ্বজুড়ে ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে সামুদ্রিক ও বায়ুমণ্ডলীয় জলবায়ুগত ঘটনা ‘এল নিনো’। এর প্রভাবে আগামী কয়েক মাসে বিশ্বব্যাপী তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা এবং বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটির মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনোর এই জোড়া প্রভাবে ইতোমধ্যেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পৃথিবী এখন এক চূড়ান্ত আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তির প্রভাব ইতোমধ্যেই বিভিন্ন প্রান্তে দৃশ্যমান। এমন এক সময়ে জাতিসংঘের এই সতর্কবার্তা সামনে এলো, যখন আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ দাবানল, যা জনজীবন ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ায় দেখা দিয়েছে মৌসুমি বৃষ্টির তীব্র প্রভাব, যার ফলে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ শুরু হয়েছে। জলবায়ু গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এসব চরমভাবাপন্ন দুর্যোগের নেপথ্যে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে শক্তিশালী হতে থাকা এল নিনো।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৫.২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। সমুদ্রের পানির এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা পুরো বৈশ্বিক আবহাওয়ার স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করবে, যা পরোক্ষভাবে বিশ্বজুড়ে গড় তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে ঋতুচক্রের পরিবর্তন এবং চরম আবহাওয়ার প্রকোপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক জরুরি বার্তায় বলেন, "এল নিনো এখন আর দোরগোড়ায় নেই, এটি সরাসরি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।"
তিনি সতর্ক করে বলেন যে, এটি কেবল শুরু মাত্র। এল নিনো ইতোমধ্যেই জ্বলতে থাকা পৃথিবীতে নতুন করে জ্বালানি যোগ করছে। এই বৈশ্বিক সংকট সামাল দিতে তিনি জীবাশ্ম জ্বালানির সম্প্রসারণ বন্ধ করার আহ্বান জানান এবং অবিলম্বে নতুন কয়লা, তেল ও গ্যাস প্রকল্প স্থগিত করার তাগিদ দেন।
ডব্লিউএমওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ার বড় অংশসহ বিশ্বের অধিকাংশ স্থলভাগেই স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রা অনুভূত হবে। বিশেষ করে আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ, ভারতীয় উপমহাদেশ, পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকায় তীব্র তাপপ্রবাহের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাবে। এসব অঞ্চলের কৃষি ও বাস্তুসংস্থানের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এল নিনো রেকর্ড মাত্রার তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে। ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্টে সাউলো জানান, শুধু আগাম পূর্বাভাস দিয়ে এই ভয়াবহ সংকট এড়ানো সম্ভব নয়। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখতে এবং জানমালের ক্ষতি কমাতে প্রতিটি দেশের সরকার ও মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে মানবজাতি এক চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।











