দক্ষিণাঞ্চলের শিল্প ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে চলেছে পটুয়াখালী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই এই শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগে গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছেন বিদেশি উদ্যোক্তারা। ইতিমধ্যে জাপান, চীন ও মালয়েশিয়ার একাধিক প্রতিনিধিদল সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখেছেন। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তৈরি পোশাক ও মোটরগাড়ি শিল্পে বিনিয়োগে তাঁদের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে বলে জানা গেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৭ সালের শুরুতেই উদ্যোক্তাদের মধ্যে শিল্প প্লট বরাদ্দ দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। মোট ৩০৬টি প্লটের মধ্যে এরই মধ্যে ৬০টি প্লট সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রস্তুত প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হবে। পুরো ইপিজেড চালু হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে পটুয়াখালীসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পটুয়াখালী শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের পঁচাকোড়ালিয়া মৌজার কয়েকটি গ্রামে ৪১০ দশমিক ৭৮ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে এই শিল্পাঞ্চল। ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় যোগাযোগের দিক থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। একই প্রকল্পের আওতায় পর্যটননগরী কুয়াকাটায় ২ দশমিক ২৫ একর জমিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইনভেস্টরস ক্লাব নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ইপিজেড অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০২৩ সালে। প্রাথমিকভাবে ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নানা প্রতিবন্ধকতায় তা সম্ভব হয়নি। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের ৩ জুন পর্যন্ত করা হয়। বর্তমানে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৪৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ১ হাজার ১০৫ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এবং ৩৩৮ কোটি টাকা বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে ব্যয় করা হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মাজেদুর রহমান খান বলেন, কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ৩০৬টি শিল্প প্লটের মধ্যে ৬০টি প্রস্তুত করা হয়েছে। জাপান, চীন ও মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তাদের একাধিক দল এলাকা পরিদর্শন করেছে এবং তাঁরা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, গার্মেন্টস ও গাড়ি শিল্পে বিনিয়োগের বিষয়ে উদ্যোক্তারা আগ্রহ দেখিয়েছেন। ২০২৭ সালের শুরুতে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রধান সড়ক ও সীমানাপ্রাচীরের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ড্রেনেজ, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ, মসজিদ, কারখানা ভবন, বিনিয়োগকারীদের আবাসন, স্টাফ ডরমিটরি ও আবাসিক ভবনের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে। জমিদাতা ১৫৪ পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য নির্মিত ঘরগুলো শিগগির হস্তান্তর করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে প্রায় ৩০ হাজার মিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা, চারটি ছয়তলা কারখানা ভবন, তিনটি বহুতল অফিস ভবন, তিনটি ১০তলা আবাসিক ভবন, জোন অফিস, কাস্টমস অফিস, নিরাপত্তা দপ্তর ও একটি হেলিপ্যাড থাকবে।
ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে ১৫৪টি পুনর্বাসন ঘর। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১৪টি ১১-০.৪১৫ কেভি সাবস্টেশন, ১৫ কিলোমিটার ১১ কেভি বিদ্যুৎ লাইন এবং একটি ৩৩-১১ কেভি জিআইএস সাবস্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থাপনায় আলাদাভাবে সোলার সিস্টেম স্থাপনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পকারখানা স্থাপনের পাশাপাশি এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার সঙ্গে আবাসন, পরিবহন, খাদ্য, ক্ষুদ্র ব্যবসা, সরবরাহ ও সেবা খাতে নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। ফলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে বড় শিল্পের ঘাটতির মধ্যে পটুয়াখালীতে এই শিল্পাঞ্চল স্থাপনকে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখছে কর্তৃপক্ষ। এখন নির্ধারিত সময়ে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করে প্লট বরাদ্দ ও শিল্পকারখানা স্থাপনের কার্যক্রম শুরু করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।





















