নির্বাচনের পর দেশের সব সমস্যার সমাধান হবে—এমন প্রতিশ্রুতি দীর্ঘ সময় ধরে জনগণকে দেওয়া হলেও, ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোনো দৃশ্যমান সংস্কার হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে আয়োজিত এক বিশাল গণসমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। মূলত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, তেল-গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল উন্নতি এবং চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধের দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

সমাবেশে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে আসিফ মাহমুদ বলেন, নির্বাচন হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে এবং ক্ষমতায় এলে সাধারণ মানুষের পেটে ভাত থাকবে—এমন কথা আমাদের দীর্ঘ দেড় বছর ধরে শুনতে হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তারা ক্ষমতায় আসার পাঁচ-ছয় মাস পার হতে চললেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর সংস্কার দেখা যায়নি; বরং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট প্রকট হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের পেটে ভাতের নিশ্চয়তাও মেলেনি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের আগে ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুবিধা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যই এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে, যা জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

চাঁদাবাজির প্রসঙ্গটি টেনে এনসিপির এই মুখপাত্র বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজির নানা অভিযোগ ক্রমাগত সামনে আসছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, কোথাও কোথাও জমিতে গরু-মহিষ চরাতেও চাঁদাদাতা পক্ষকে অর্থ দিতে হচ্ছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আসিফ মাহমুদ আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচনের আগে বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। অথচ তার দাবি, ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ব্যাপকভাবে সামনে এসেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আসিফ মাহমুদ। তার দাবি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকলে সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন না। ফলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তা প্রকৃত অর্থে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভোটের সুযোগ তৈরি করবে না। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার ভাষ্যমতে, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো নির্বাচনের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে নির্বাচন কমিশনসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা হলে একটি সমতাভিত্তিক নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। এসব প্রশাসকদের কেউ যদি পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হন, তবে সেই নির্বাচন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে এবং স্বচ্ছতা নষ্ট হবে। বিএনপির সমালোচনা করে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, দলটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ও দলীয় প্রচারণার অভিযোগ উঠছে। সরকারি অর্থে দলীয় প্রতীক ও ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে প্রচারণা চালানোকে তিনি ‘গণতন্ত্রের’ আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন।

আসিফ মাহমুদ স্পষ্ট করে বলেন, এনসিপির পক্ষ থেকে জোরালো দাবি জানানো হয়েছে যে, যেসব ব্যক্তিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন কোনোভাবেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন। তারা নির্বাচনে অংশ নিলে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবশেষে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে গিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, ভারতের দিক থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরতে চান—এমন আলোচনা শোনা যাচ্ছে এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাও এ বিষয়ে কথা বলছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে আইনের শাসন অনুযায়ী সঠিক বিচার নিশ্চিত করার জন্য এনসিপি সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।