সচিবালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক করে রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী চূড়ান্ত করার যে অভিযোগ সম্প্রতি রাজনৈতিক মহলে ছড়িয়েছে, তা স্পষ্টভাবে ও দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির শীর্ষ নেতাদের জোরালো দাবি, সেখানে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি; বরং স্থায়ী কমিটির সদস্যরা অনেক আগেই দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রার্থী চূড়ান্ত করার পূর্ণ দায়িত্ব ও ক্ষমতা অর্পণ করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পরই দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর নির্বাচন কমিশন ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দলটির নেতারা এসব কথা জানান। নির্বাচনী কার্যক্রমের প্রধান তদারককারী ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) নিকট বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয়। এই মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রস্তাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান এবং সমর্থক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দলটির সিনিয়র নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, দুপুর ২টার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে উপস্থিত হন। এরপর দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে আগামী ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা প্রদান করা হয়।
সচিবালয়ে বিএনপির প্রার্থিতা সংক্রান্ত আলোচনার বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক উত্থাপিত সমালোচনার জবাবে প্রতিনিধি দলের সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, "আমাদের প্রধানমন্ত্রী দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন এবং দলই তাকে মনোনীত করেছে। যে বিষয়ে কথা বলা হচ্ছে, সেটি কোনো আনুষ্ঠানিক মিটিং ছিল না, বরং আমরা কেবল কিছু আলোচনা করেছি। বাংলাদেশের যেকোনো স্থানে এ ধরনের আলোচনা হতে পারে। সিদ্ধান্তটি আগেই গৃহীত হয়েছিল এবং সেটি আমাদের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন।"
একই প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্পষ্টভাবে জানান, এটি কোনো স্থায়ী কমিটির বৈঠক ছিল না। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা আগেই দলীয় চেয়ারম্যানকে প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, যার প্রেক্ষিতেই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রার্থীর বিষয়ে নূরুল ইসলাম মনি আরও বলেন, "আমাদের দল ও জোটের পক্ষ থেকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনীত করা হয়েছে এবং আমরা দৃঢ়ভাবে চাই আগামী ২০ আগস্ট তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্ব গ্রহণ করুন।"
১১ দলীয় ঐক্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে তিনি বলেন, "গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্যই হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং তার মাধ্যমে নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করা। দীর্ঘ ১৭ বছরের কঠোর আন্দোলনের পর একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা সংসদ গঠন করেছি, যেখানে বর্তমানে দেশের সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ দলের সবাই নিরলস পরিশ্রম করছেন। গত ১৭ বছরের জমে থাকা জঞ্জাল আমরা গত ৫ মাসে যতটুকু সম্ভব পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছি এবং ভবিষ্যতেও এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ২০ তারিখে আমাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন এবং আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করব।"
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, "গণভোটের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। গণভোটের ফলাফল কেউ মানতে পারে, আবার কেউ নাও মানতে পারে; তবে আমরা তা মানব এবং সেই গণভোটের প্রতিফলন পর্যায়ক্রমে সংসদে প্রতিফলিত হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রক্রিয়া। এটিকে কেবল নিয়ম রক্ষার চেষ্টা বলা সঠিক হবে না। অনেকে বলতে পারেন তারা পরাজিত হবে জেনেও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান না করে অংশগ্রহণ করাটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি তাদের এই উদ্যোগকে অভিনন্দন জানাই।"
বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রী কে হতে যাচ্ছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, "এই বিষয়ে একটু অপেক্ষা করুন, সঠিক সময়েই আপনারা বিস্তারিত জানতে পারবেন।"
মনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় বিএনপির নেতাদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউস, রকিবুল ইসলাম বকুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, আখতারুজ্জামান মিয়া, এ বি এম আশরাফ উদ্দিন (নিজান) এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী, আবদুস সালাম আজাদ ও ইমরান সালেহ প্রিন্স।











