পরিকল্পনার চরম ঘাটতি এবং সময়মতো জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণেই বর্তমানে দেশে তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, এই কৃত্রিম সংকটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পরিকল্পিতভাবে কিছু বিশেষ বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বুধবার (১২ আগস্ট) রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিস্তারিত বার্তায় তিনি এসব গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন।

নাহিদ ইসলাম তাঁর বার্তায় অভিযোগ করেন, বিএনপি জনগণের সরকার গঠনের কথা বলে ক্ষমতায় এলেও বাস্তবে তারা অলিগার্ক বা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার পথে হাঁটছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি স্পষ্টভাবে ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা’ এবং একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তাঁর ভাষ্যমতে, মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই সরকার সেই প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, জ্বালানি আমদানি এবং বিদ্যুৎ বিতরণের প্রক্রিয়ায় বেসরকারিকরণের দোহাই দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতের দায়মুক্তি আইনসহ পূর্ববর্তী সরকারের বিতর্কিত বিভিন্ন আইন বাতিলের কথা বলা হয়েছিল। নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, পতিত ফ্যাসিবাদী সরকার এই দায়মুক্তির সুযোগ নিয়ে কুইক রেন্টাল এবং আইপিপির মাধ্যমে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে। তাঁর দাবি, বিএনপি একসময় এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও বর্তমানে তারা একই ধরনের নীতি অনুসরণ করছে।

সাম্প্রতিক কিছু গণমাধ্যম প্রতিবেদনের উদাহরণ দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস বড় পরিমাণে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাজারজাত করার অনুমতি চেয়ে সরকারকে চিঠি দিয়েছে। এর পরপরই ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) মাত্র চার দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ১০ আগস্টের মধ্যে ‘বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা ২০২৬’-এর খসড়া জমা দিতে নির্দেশ দেয়। নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, এই তাড়াহুড়ো এবং বিতর্কিত নীতিমালার খসড়া তৈরিতে আপত্তি জানানোয় বিপিসির চেয়ারম্যানকে অন্যায়ভাবে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন একটি জ্বালানি নীতিমালার খসড়া তৈরির জন্য মাত্র চার দিন সময় নির্ধারণ করা বিএনপির ‘সুশাসনের’ কী নমুনা?

একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ১০ দিন করেছে। তাঁর আশঙ্কা, সময়ের এই চরম সংকুচনের ফলে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা দরপত্রে অংশ নিতে পারবে না, যার ফলে দরদাতার সংখ্যা কমে যাবে। এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের আধিপত্য তৈরি হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তিনি প্রশ্ন করেন, যদি প্রকৃত উদ্দেশ্য অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়ে থাকে, তবে চার দিনের সময়সীমা কেন নির্ধারণ করা হলো? তদন্ত কমিটিকে মাত্র দুই দিন সময় দেওয়ার কারণ কী এবং বিপিসির চেয়ারম্যানকে সরানোর ক্ষেত্রে এত তাড়াহুড়ো কেন করা হলো?

নাহিদ ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, বিএনপি সরকারের সময়ে দেশে ‘লোডশেডিং’ শব্দটি আবারও সাধারণ মানুষের পরিচিত শব্দ হয়ে উঠছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালেও উৎপাদন না বাড়িয়ে কেবল বিতরণ লাইন সম্প্রসারণের মাধ্যমে এক ধরনের অসমন্বিত উন্নয়ন দেখা গিয়েছিল। দুই দশক অতিবাহিত হওয়ার পরও বিএনপি সেই অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে যে দাবি করা হচ্ছে যে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নেই—তা সম্পূর্ণ ভুল বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব মতে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া ১ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ৯১৫ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।

নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, ‘বাস্তবে ডলার আছে, কিন্তু নেই ক্রয়ের সঠিক সময়সূচি এবং সময়সূচিভিত্তিক ক্রয় পরিকল্পনা।’ তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বছরের প্রথম কয়েক মাস জ্বালানি আমদানি করা হলেও পরবর্তীতে প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে ক্রয়প্রক্রিয়া সচল রাখা হয়নি, আর সেখান থেকেই সংকটের সূত্রপাত। তাঁর ভাষায়, ‘বিষয়টি এমন নয় যে বিপিসিকে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল আর বিপিসি ব্যর্থ হয়েছে; বরং বিপিসিকে প্রয়োজনীয় ক্রয় শিডিউলের অনুমোদনই সময়মতো দেওয়া হয়নি।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, পছন্দের সরবরাহকারীদের চাপ দিতে গিয়েই কি জ্বালানি আমদানির সময়সূচি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিপর্যস্ত করা হয়েছে?

একটি ধারাবাহিক কৌশলের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথমে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে দেওয়া হবে না, এরপর সংকট তৈরি হলে বলা হবে সরকারি খাত সক্ষম নয়, এবং সবশেষে বেসরকারি অলিগার্কদের হাতে লাইসেন্স তুলে দেওয়া হবে। বিদ্যুৎ বিতরণেও একই কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। ভুতুড়ে বিল এবং জালিয়াতির অভিযোগগুলোকে সামনে এনে পরবর্তীতে বিতরণব্যবস্থা বেসরকারিকরণের যুক্তি তৈরি করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

বর্তমানে দেশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিং চলছে বলে দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগে ৯ আগস্ট ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট এবং ৩ আগস্ট ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। বর্তমানে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। তিনি দাবি করেন, গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। সরকার যদিও এই সংকটের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে দায়ী করছে, তবে সেটিকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। পিজিসিবির তথ্য দিয়ে তিনি দেখান, যুদ্ধ শুরুর আগেই এপ্রিল মাসে লোডশেডিং পরিস্থিতি নাজুক ছিল। এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ দৈনিক লোডশেডিং ছিল ৪১ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা, জুলাইয়ে ৩২ হাজার এবং আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টায়। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগেই সংকট তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

জ্বালানি সংকটের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে তিনি মহেশখালীর এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটির কথা উল্লেখ করেন। ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) আগুন লাগার পর দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ৫ আগস্ট আংশিক সরবরাহ পুনরায় শুরু হতে ১৫ দিন সময় লেগেছে। এই ঘটনায় তিনি একটি স্বাধীন তদন্তের দাবি জানান এবং প্রশ্ন তোলেন, রক্ষণাবেক্ষণে কোনো গুরুতর ত্রুটি ছিল কি না এবং তদন্ত প্রতিবেদন কোথায়। দেশের গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মাত্র দুটি টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকা এবং একটিতে সমস্যা হলে ১৫ দিন সময় লাগা রাষ্ট্রের দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ জনস্বার্থে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা, সেই সংস্থাই এখন নিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষক হয়ে উঠেছে। এলপিজি খাতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি আমদানিকারকদের হাতে খাতটি ছেড়ে দেওয়ার পর সিলিন্ডারের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। একই প্রক্রিয়ায় এখন ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন আমদানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু যানবাহনের ভাড়া বাড়ে না, বরং সেচ, পরিবহন এবং বাজারের নিত্যপণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়ে।

জুলাই বিপ্লবের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেই বিপ্লবের অভিযোগ শুধু একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিল যেখানে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো কয়েকটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থে নেওয়া হতো এবং যার মূল্য দিতে হতো সাধারণ মানুষকে। ব্যাংক লুট, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে অনিয়ম এবং দায়মুক্তি আইনের আশ্রয় নেওয়া ছিল সেই ব্যবস্থার অংশ। মানুষ শুধু শাসক পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য রক্ত দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে রাষ্ট্র জনগণের প্রতিনিধির বদলে কয়েকটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ব্যবস্থাপকের ভূমিকায় চলে যাচ্ছে। ফলে বিএনপির হাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান নেই এবং তাদের পরিকল্পনা ও পলিসিই এই খাতের নতুন সমস্যা সৃষ্টি করছে।

এই সংকট মোকাবিলায় নাহিদ ইসলাম ১৫ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত করে উন্মুক্ত অংশীজন আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ১০ দিন থেকে পুনরায় ৪২ দিনে ফিরিয়ে নেওয়া। তিনি বিপিসির সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর সময়ের ক্রয় শিডিউল দ্রুত অনুমোদনের পাশাপাশি সঠিক চাহিদা যাচাই করে পরবর্তী চার থেকে ছয়টি অর্থনৈতিক প্রান্তিকের ক্রয় ক্যালেন্ডার প্রকাশের প্রস্তাব দেন। মহেশখালীর এফএসআরইউ দুর্ঘটনার একটি স্বাধীন কারিগরি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানান তিনি।

গ্যাস বরাদ্দে তথ্যভিত্তিক অগ্রাধিকার ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি-সাশ্রয়ী, রপ্তানিমুখী ও শ্রমঘন শিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারা আগে গ্যাস পাবে, তা তদবিরের পরিবর্তে স্বচ্ছ সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। বিপিসির একচেটিয়া ব্যবসা ভাঙতে নতুন কোনো একক গোষ্ঠীর আধিপত্য তৈরি না করে প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র, একাধিক অংশীদার, স্বচ্ছ জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রস্তাব দেন তিনি।

পরিশোধিত তেল আমদানির পরিবর্তে অপরিশোধিত তেল আমদানির অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, আমদানিকারকদের নিজস্ব রিফাইনারি স্থাপনের শর্ত রাখা হোক। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে সমান সুযোগ দিয়ে নিজেদের ব্যবহারের পাশাপাশি বিতরণ নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ দিলে দেশে সক্ষমতা বাড়বে এবং ডলার সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে পাচার ঠেকাতে এলসি নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে রাখার এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানান তিনি।

ক্যাপাসিটি চার্জের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষার দাবি জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৃত বিনিয়োগের বিপরীতে কত অর্থ দেওয়া হয়েছে তা যাচাই করতে হবে এবং বিনিয়োগের চেয়ে বেশি অর্থ তুলে নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পেমেন্ট বন্ধ করতে হবে। তাঁর দাবি, এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও বছরে ৪৪ হাজার থেকে ৪৮ হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে আইপিপিগুলোর কাছে পিডিবির বকেয়া ২৭ হাজার থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই খাতে দায়মুক্তি আইন অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান তিনি। আইপিপির বকেয়া পরিশোধে আঞ্চলিক মডেল অনুসরণের পাশাপাশি বিতরণ সংস্থাগুলোর সিস্টেম লস কমানো এবং বিল আদায়ের দক্ষতা বাড়ানোর বাধ্যতামূলক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি।

বিদ্যুৎ বিলে স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক করার কথা বলেন তিনি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লস প্রায় ৯ শতাংশ এবং গ্যাসে ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। সিস্টেম লসের সঙ্গে চুরির গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং এই অনিয়মে বিদ্যুৎ বিভাগের নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের মানুষ জড়িত। এলপিজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে ফিরিয়ে আনা এবং একচেটিয়া ব্যবসা ভাঙতে নতুন ব্যবসায়ী যুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি। বাসাবাড়ির গ্যাস ব্যবস্থায় চুরি কমাতে বিকল্প ব্যবস্থায় রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা বলেন তিনি।

এলএনজি সরবরাহ বাড়াতে মহেশখালীর বাইরে তৃতীয় ও চতুর্থ এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাব দেন নাহিদ ইসলাম এবং পছন্দের কোনো পক্ষকে খুঁজতে গিয়ে সময়ক্ষেপণ বন্ধ করার আহ্বান জানান। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি (পিএসসি) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার প্রস্তাবও দেন তিনি। দীর্ঘ সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কোরিয়ান পস্কোর মতো যেসব প্রতিষ্ঠান চলে গেছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে সরকারি পর্যায়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া এবং অভিজ্ঞ বাণিজ্য আলোচক নিয়োগের পরামর্শ দেন তিনি। বাপেক্সে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তি ও গবেষণার ঘাটতি পূরণে বিদেশি অংশীদার যুক্ত করার কথা বলেন তিনি। রিজার্ভার ব্যবস্থাপনা, অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খননে সক্ষম বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেন তিনি।

সৌরবিদ্যুৎকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করতে প্যানেল, কনভার্টার, ব্যাটারি ও সৌরবিদ্যুৎচালিত যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেন নাহিদ ইসলাম। সোলার হোম, মিনি, মিডি ও বড় প্রকল্প—সব পর্যায়েই এই সুবিধা দেওয়ার কথা বলেন তিনি। নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের বড় একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎনির্ভর করার পাশাপাশি নেট মিটারিং ও ফিড-ইন ব্যবস্থার কাঠামো স্পষ্ট করা এবং নির্দিষ্ট আয়তনের বেশি বাণিজ্যিক ও শিল্প ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন তিনি। তাঁর দাবি, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্তত ১০ বছর পিছিয়ে আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের দৃশ্যমান লক্ষ্য নির্ধারণের আহ্বান জানান তিনি।

পরিশেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, জ্বালানি খাত সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। এ খাতের ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর, যারা কোনো কমিশন পান না। সরকারের প্রথম দায়িত্ব জনগণের প্রতি, কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রতি নয়। আগের সরকার এই নীতি ভুলে গিয়েছিল এবং বিএনপি সরকারও এখন একই পথে এগোচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, ‘মাফিয়া তোষণের মূল্য বাংলাদেশ একবার দিয়েছে, আর নয়।’ ভুল সিদ্ধান্ত, ব্যর্থতা ও অলিগার্ক তোষণের নীতির বিরুদ্ধে এনসিপি কঠোর অবস্থান নেবে বলেও তিনি জানান।