জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকায় এক বিশাল সমাবেশ ও গণমিছিলে অংশ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। বুধবার ঢাকা মহানগর কর্তৃক আয়োজিত এই কর্মসূচিতে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মানব রচিত কোনো তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব নয়; বরং এর একমাত্র কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান হলো ইসলাম।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুফতি রেজাউল করীম দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্দোলনের ত্যাগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, "আমরা এই লক্ষ্য অর্জনে বারবার জীবন দিয়েছি, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। আমাদের সন্তানদের এতিম হতে হয়েছে, অনেক নারী বিধবা হয়েছেন। এই আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।" তবে তিনি আক্ষেপ করে জানান, যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে এই চরম ত্যাগ স্বীকার করা হয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি রূপকের মাধ্যমে বর্ণনা করে তিনি বলেন, আমরা যেন 'শৃগালের হাতে মুরগি' তুলে দেওয়ার মতো মারাত্মক ভুল করেছি। তিনি মনে করেন, মানব রচিত আইনের মাধ্যমে বৈষম্য দূর করা বা জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করা অসম্ভব। বিশেষ করে সমাজের বৈষম্য রোধ করতে, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সংখ্যালঘুদের শান্তি ফিরিয়ে আনতে ইসলামই একমাত্র পরীক্ষিত ও কার্যকর পদ্ধতি বলে তিনি দাবি করেন।
পীর সাহেব চরমোনাই হিসেবে পরিচিত মুফতি রেজাউল করীম আরও উল্লেখ করেন যে, জুলাই বিপ্লবের পর তৈরি হওয়া সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা ইসলামের ভিত্তিতে একটি সমঝোতা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই সমঝোতা যখন সম্ভাবনাময় হয়ে উঠলো, তখন কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ক্ষমতার লোভে নিজেদের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে প্রচলিত শাসন পদ্ধতিতে ফিরে যেতে আগ্রহী হয়। এর ফলে বাংলাদেশে ইসলামের সম্ভাবনা যেমন নষ্ট হয়েছে, তেমনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত লক্ষ্য ও প্রত্যাশাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সমাবেশে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান। তিনি গুম হওয়া ব্যক্তিদের তদন্তের দায়িত্ব পুনরায় পুলিশের ওপর অর্পণ করার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি একে জুলাই চেতনার সাথে এক ধরণের 'স্পষ্ট গাদ্দারি' হিসেবে অভিহিত করেন। তার মতে, অতীতে গুম ও অপহরণের ঘটনার সাথে পুলিশ সদস্যদের গভীর সম্পৃক্ততা ছিল, তাই তাদের হাতে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। তিনি আরও বলেন, অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষ আশা করেছিল যে দেশের সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে, কিন্তু বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে সেই আশা এখন ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি শেখ ফজলুল করীম মারুফ তার বক্তব্যে রাজধানীর নাগরিক সমস্যাগুলোর দিকে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বসবাস অযোগ্যের তালিকায় ঢাকা শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নগরবাসী মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, আগামী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জয়ী হলে তারা ইনশাআল্লাহ ঢাকাকে একটি পরিকল্পিত এবং বসবাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলবেন।
কে এম শরীয়াতুল্লাহর সঞ্চালনায় এই সমাবেশে আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী, আশরাফ আলী আকন, অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, যুগ্ম মহাসচিব শেখ ফজলে বারী মাসউদ, সহকারী মহাসচিব আহমদ আবদুল কাইয়ূম এবং দফতর সম্পাদক মাওলানা লোকমান হোসাইন জাফরী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম, নগর দক্ষিণ সহ-সভাপতি জি এম রুহুল আমীন, আলহাজ্ব এম এইচ মোস্তফা, নগর উত্তরের সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার মুরাদ হোসেন এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুনতাসির আহমদসহ আরও অনেকে।










