জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) নেতাকর্মীদের ওপর দফায় দফায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। ক্যাম্পাসের ভেতরে শুরু হওয়া এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের বিছানায় গিয়ে পৌঁছেছে। অভিযোগ উঠেছে, ক্যাম্পাসে হামলার পর ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত শিক্ষার্থীদের ওপর পুনরায় হামলা চালিয়েছে ছাত্রদল।

জকসু নেতাদের দাবি, মঙ্গলবার বিকেলে পুরান ঢাকার জনসন রোডে অবস্থিত ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি থাকা শিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের ওপর আকস্মিক ও পরিকল্পিত হামলা চালায় ছাত্রদল নেতারা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতালের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের চোখের সামনেই এই হামলা চালানো হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভিকটিমেরা।

পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয় মঙ্গলবার সকালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ইউজিসি চেয়ারম্যানের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জকসু, ছাত্রশিবির এবং ছাত্রশক্তির প্রতিনিধিরা ইউজিসি চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা ও দাবির বিষয়ে। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুত সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা, কেরানীগঞ্জে পরিকল্পিত অস্থায়ী আবাসন প্রকল্পের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের সুযোগ-সুবিধা ও চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন।

তবে এই শান্তিপূর্ণ দাবি জানানোর প্রচেষ্টাই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। জকসু প্রতিনিধিরা যখন প্ল্যাকার্ড নিয়ে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে প্রবেশের চেষ্টা করেন, তখন তাদের বাধা দেয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে কথা-কাটাকাটি থেকে শুরু করে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। অভিযোগ করা হয়েছে, ছাত্রদল নেতারা জোরপূর্বক তাদের কাছ থেকে প্ল্যাকার্ড কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলেন এবং শুরু করেন শারীরিক হামলা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, জকসু ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলামসহ অন্যান্য নেতারা অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করতে গেলে ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল তাদের বাধা দিচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ড. কে এ এম রিফাত হাসানকে ধাক্কা দেন ছাত্রদল আহ্বায়ক হিমেল। ভিডিওতে তাকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ‘এই দরজা বন্ধ করো। দ্রুত গেট আটকাও।’ এরপরই অডিটোরিয়ামের গেট আটকে দেওয়া হয়।

এই সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়েছেন জকসু সহসভাপতি (ভিপি) মো. রিয়াজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আব্দুল আলিম আরিফ, এজিএস মাসুদ রানা ও আইনবিষয়ক সম্পাদক ফারুক। পাশাপাশি জবি ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহিন মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখও গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

জকসু নেতাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো ইউজিসি চেয়ারম্যানের সামনে তুলে ধরতে চাওয়াতে তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তা বাধাগ্রস্ত করে সরাসরি হামলা চালানো হয়েছে। জকসু জিএস আব্দুল আলিম আরিফ তার ফেসবুক প্রোফাইলে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘প্রক্টর ছাত্রদল হয়ে গেছে, নাকি ছাত্রদল প্রক্টরের ভূমিকায়? আমন্ত্রণ জানিয়েও অডিটোরিয়ামে প্রবেশে বাধা। ধাক্কাধাক্কি করা শুধু ছাত্রদলের দ্বারাই সম্ভব।’

একই সাথে জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদলের হামলা এবং শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেছে প্রক্টর অফিস ও ছাত্রদলের ক্যাডাররা। এছাড়া জকসুর প্রতিনিধিদের নির্মমভাবে ধাক্কা দেওয়া হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই ভূমিকা এবং ছাত্রদলের এমন আচরণে ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।