দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় এবার যাত্রীবাহী লঞ্চের ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয় বাড়ার ফলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২৩ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। সামগ্রিকভাবে যাত্রীবাহী লঞ্চের ভাড়া ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সাধারণ যাত্রীদের জন্য সর্বনিম্ন ভাড়া আগে ৩২ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা বাড়িয়ে ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করে নৌযান মালিকরা প্রথমে ১৫ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন। তবে সাধারণ যাত্রীদের আর্থিক সক্ষমতা ও দুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে সরকার তা কমিয়ে ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ রেখেছে।
মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম তার বক্তব্যে বলেন, "ভাড়া বৃদ্ধি কোনোভাবেই কাম্য নয়। তবে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং তেলের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে এই সিদ্ধান্ত নিতে আমরা বাধ্য হয়েছি। আমরা চেষ্টা করেছি যেন সর্বনিম্ন ভাড়া বৃদ্ধির পরিমাণটি সাধারণ মানুষের জন্য সহনীয় হয়।" তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ভাড়া বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে যেন কোনো চালক বা মালিক স্বেচ্ছাচারিতা করতে না পারেন। ভাড়া বৃদ্ধির নামে কোনো ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, সিএনজির দাম বৃদ্ধি পায়নি, তাই সিএনজিচালিত যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোর কোনো যৌক্তিক সুযোগ নেই। যদি কোনো সিএনজি চালক বাড়তি ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে দ্রুত তা জানাতে অনুরোধ করেন তিনি এবং জানান যে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে, লঞ্চ ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল সংস্থার সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, প্রথম ১০০ কিলোমিটারের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩ টাকা ১৮ পয়সা করা হয়েছে। একইভাবে ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৫২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭২ পয়সা করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, মালিকদের প্রস্তাবিত ভাড়ার হার আরও বেশি ছিল, তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও জনস্বার্থ বিবেচনা করে তারা এই বর্ধিত হার মেনে নিয়েছেন। এর আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাপ) সংস্থার মাধ্যমে লঞ্চ মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন।
লঞ্চের পাশাপাশি দেশের সড়ক পরিবহনের ক্ষেত্রেও ভাড়ার হার বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মহানগর, আন্তঃজেলা এবং দূরপাল্লার বাস ও মিনিবাসের প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ১৭ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সহকারী সচিব জসিম উদ্দিনের স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বিস্তারিত ভাড়া তালিকা দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ক্ষেত্রে যাত্রীপ্রতি প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সার পরিবর্তে ২ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার রুটে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে।
এছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর পাশাপাশি ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আওতাধীন বিভিন্ন জেলা যেমন—নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলার অভ্যন্তরে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৪৩ পয়সার স্থলে ২ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের জন্য সর্বনিম্ন ভাড়া যথাক্রমে ১০ টাকা এবং ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ধারাবাহিক ভাড়া বৃদ্ধির ফলে সাধারণ যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াত খরচ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।





















