যশোরের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে এক মর্মান্তিক ঘটনায় সিজার অপারেশনের পর এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সসহ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চরম অবহেলা ও অসাবধানতার কারণে এই মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন রোগীর স্বজনরা। তাদের দাবি, অপারেশনের সময় অসতর্কতার কারণে নবজাতকের মাথা, ঠোঁট এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়, যার ফলে শিশুটি প্রাণ হারায়।
গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডে এই ঘটনাটি ঘটে, যা মুহূর্তের মধ্যেই পুরো হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং রোগীর স্বজনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি ভিন্ন; তাদের মতে, শিশুটির মৃত্যু সিজারের সময় কোনো আঘাতের কারণে হয়নি, বরং অপারেশনের আগেই অন্য কোনো জটিলতায় তার মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, সদর উপজেলার রায়মানিক কচুয়া গ্রামের বাসিন্দা সাগর হাসান তার স্ত্রী তাসমিরার প্রসব বেদনা শুরু হলে বৃহস্পতিবার ভোরে তাকে দ্রুত সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের প্রাথমিক পরীক্ষার পর প্রসূতিকে দ্রুত লেবার ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় এবং চিকিৎসকরা দ্রুত সিজার অপারেশনের প্রয়োজনীয়তা জানান। এরপর সকাল ১০টার দিকে গাইনি বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
অপারেশনের পর চিকিৎসকরা পরিবারের সদস্যদের জানান যে, তাদের একটি পুত্র সন্তান হয়েছে, তবে নবজাতকের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। পরিবারের সদস্যরা আবেগপ্লুত হয়ে তাদের সন্তানকে দেখতে চাইলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা করতে দেয় না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা এবং সন্দেহ জাগলে স্বজনরা যখন জোর করে লেবার ওয়ার্ডে প্রবেশ করেন, তখন নার্সরা তাদের জানান যে শিশুটি মৃত।
চিকিৎসক ও নার্সদের অসংলগ্ন কথাবার্তায় ক্ষুব্ধ স্বজনরা যখন মৃত নবজাতকটিকে কোলে নেন, তখন তারা দেখতে পান শিশুটির মাথায়, ঠোঁটে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে কাটা চিহ্ন রয়েছে। এই দৃশ্য দেখে স্বজনরা যখন কর্তৃপক্ষের কাছে কৈফিয়ত চান, তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক কোনো কথা না বলে দ্রুত অপারেশন থিয়েটার থেকে চলে যান।
রক্তাক্ত কাপড়ে মোড়ানো নবজাতকটিকে কোলে নিয়ে বিচার চাইতে লেবার ওয়ার্ড থেকে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কক্ষের দিকে যাচ্ছিলেন মৃত শিশুর খালা রহিমা খাতুন। তিনি অত্যন্ত শোকাতুর কণ্ঠে জানান, পাঁচ দিন আগে যখন তাসমিরার গর্ভের সন্তান নড়াচড়া করছিল না, তখনই তারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সেই সময়ে বিভিন্ন পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন যে মা ও সন্তান উভয়েই সুস্থ আছেন। ভোরে প্রসব বেদনা শুরু হলে চিকিৎসকের পরামর্শেই সিজার করানো হয়। কিন্তু অপারেশনের পর দীর্ঘ সময় তাদের সন্তানকে দেখতে দেওয়া হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, শিশুটি যদি মারা গিয়ে থাকে, তবে তা অপারেশনের পরপরই কেন জানানো হলো না? তিন ঘণ্টা পর যখন শিশুকে দেওয়া হয়, তখন দেখা যায় তার সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত। এরপরও চিকিৎসকরা যথাযথ ব্যবস্থা নেননি। পরে যখন জানানো হয় শিশুটি মৃত, তখন শিশুটিকে সামান্য নড়তে দেখে তারা দ্রুত অন্য হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে একটি বেসরকারি ক্লিনিকেও নিয়ে যান, কিন্তু সেখানেও চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। রহিমা খাতুনের অভিযোগ, মৃত্যুর পর শিশুটিকে নিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসকরা অত্যন্ত অমানবিক আচরণ করেছেন।
সাগর ও তাসমিরা দম্পতির জীবনে প্রথম সন্তানের আগমনে যে আনন্দের পরিবেশ ছিল, তা মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়েছে। শোকাতুর বাবা সাগর হাসান দাবি করেন, চিকিৎসকদের চরম অবহেলায় তার সন্তান মারা গেছে এবং তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, "লেবার ওয়ার্ডে তাসমিরা এখন সুস্থ থাকলেও তাকে এখনো প্রকৃত সত্য জানানো হয়নি। তাকে বলা হয়েছে যে তার ছেলে হয়েছে এবং সে অসুস্থ, যার চিকিৎসা চলছে। আমাদের প্রথম সন্তান বলে আমরা সবাই খুব খুশি ছিলাম, দুই পরিবারে আনন্দের জোয়ার বইছিল। এখন সবাইকে কী জবাব দেব? আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি চাই, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো পরিবারের এমন করুণ অভিজ্ঞতা না হয়।"
অন্যদিকে, হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. আহসান কবির বাপ্পী এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, নবজাতকের শরীরে যেসব ক্ষত চিহ্ন দেখা যাচ্ছে, সেগুলো সিজার অপারেশনের সময় তৈরি হওয়া কাটা নয়। তার ধারণা, সিজারের আগেই অন্য কোনো কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। তবে তিনি জানান, স্বজনদের লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা হবে এবং যদি চিকিৎসক, নার্স বা অন্য কারো অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।















