অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট ম্যাচে ব্যাটিংয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ল বাংলাদেশ। স্বাগতিকদের বিধ্বংসী বোলিং আক্রমণের সামনে কার্যত অসহায় হয়ে পড়া সফরকারীরা মাত্র ৩৪ ওভারে ৬৪ রানেই অলআউট হয়ে গেছে। এই চরম বিপর্যয়ের মূল কারিগর ছিলেন মিচেল স্টার্ক, যার আগুনের মতো বোলিংয়ের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। পুরো ইনিংসে বাংলাদেশের প্রথম ১০ জন ব্যাটারের মধ্যে মাত্র চারজন দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ১৪ রান করেছেন শরিফুল ইসলাম এবং ১১ রানে অপরাজিত থেকেছেন তাইজুল ইসলাম।
ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ এরেনা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই টেস্ট ম্যাচে টস জিতে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। তবে ইনিংসের শুরুতেই নেমে আসে চরম বিপর্যয়। প্রথম বলেই মিচেল স্টার্কের বলে আউট হয়ে যান সাদমান ইসলাম। মিডল স্টাম্পের ওপর পিচ করে সামান্য বাইরে বেরিয়ে যাওয়া বলে ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে গালিতে ক্যামেরন গ্রিনের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। এভাবে গোল্ডেন ডাকের লজ্জায় ফেরেন সাদমান।
সাদমানের বিদায়ের পর ব্যাটিংয়ে আসেন তানজিদ হাসান তামিম, তবে তিনিও রানের খাতা খুলতে পারেননি। স্টার্কের পরের ওভারের দ্বিতীয় বলে ফুল লেংথ ডেলিভারিতে ব্যাটের কানায় লেগে তৃতীয় স্লিপে বাউ ওয়েবস্টারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন এই বাঁহাতি ওপেনার। ডারউইনে প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তামিম টানা দুই ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়ে বড় ধাক্কা দিলেন দলকে।
দুই ওপেনারের দ্রুত পতনের পর বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর বিদায় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। স্টার্কের দ্বিতীয় ওভারের তৃতীয় বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন শান্ত। বলটি মিডল স্টাম্পে পিচ করে লেগ স্টাম্পের দিকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় শান্তর প্যাডে আঘাত করে। আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিউ নিলেও আম্পায়ার্স কলের কারণে সিদ্ধান্ত বহাল থাকে এবং শান্তও শূন্য রানে মাঠ ছাড়েন।
শান্তর পর মুমিনুল হকও খুব বেশি সময় ক্রিজে টিকতে পারেননি। স্টার্কের তৃতীয় ওভারের পঞ্চম বলে অফ স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারিতে অযথা শট খেলতে গিয়ে গালিতে ক্যাচ দেন তিনি। মাত্র ৯ রান করে ফেরেন মুমিনুল। অবিশ্বাস্যভাবে নিজের প্রথম তিন ওভারের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রথম চার ব্যাটারকে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠান স্টার্ক।
এরপর ব্যাটিংয়ে নামেন লিটন কুমার দাস। একবার জীবন পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। স্টার্কের বলে স্লিপে লিটনের সহজ ক্যাচ মিস করেন বাউ ওয়েবস্টার। তবে ভাগ্য বেশিদিন সহায় ছিল না; পরের বলেই লিটনকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন স্টার্ক। আম্পায়ার প্রথমে আউট না দিলেও অস্ট্রেলিয়া রিভিউ নেয় এবং রিপ্লেতে দেখা যায় বলটি লেগ স্টাম্পে আঘাত করত। ফলে লিটনও শূন্য রানেই বিদায় নেন।
পঞ্চম উইকেটের পতনের পর বাংলাদেশের বিপর্যয় থামেনি। প্যাট কামিন্সের অফ স্টাম্পের বাইরে পিচ করে ভেতরে ঢুকে আসা বলে ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে বোল্ড হন অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম। ৪২ বলে মাত্র ৫ রান করে মাঠ ছাড়েন তিনি। মুশফিকের বিদায়ে বাংলাদেশ মাত্র ২১ রানেই ৬ উইকেট হারিয়ে চরম সংকটে পড়ে।
এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। প্রথম সেশনের শেষ ৪৫ বলে কোনো উইকেট পড়তে দেননি তারা। লাঞ্চ বিরতির সময় ২৩ ওভারে ৬ উইকেটে ৩৫ রান নিয়ে যায় বাংলাদেশ। মিরাজ ৪৮ বলে ১১ এবং হাসান মাহমুদ ২৪ বলে ৮ রানে অপরাজিত ছিলেন। এই জুটিতে ৪৫ বলে ১৪ রান যোগ হয়।
তবে লাঞ্চের পর দ্বিতীয় সেশনের দ্বিতীয় ওভারেই ভেঙে যায় এই জুটি। প্যাট কামিন্সের বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ৫১ বলে ১১ রান করে ফেরেন তিনি। তার বিদায়ে ২৫ ওভারে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ৩৬ রান। এরপর তিন ওভারের মধ্যেই জশ হেজেলউডের লেগ স্টাম্পের শর্ট ডেলিভারি ফাইন লেগের দিকে খেলতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন হাসান মাহমুদ। শর্ট ফাইন লেগে থাকা নাথান লায়ন সহজ ক্যাচটি লুফে নেন। ৩৬ বলে ১০ রান করেন হাসান। তার বিদায়ে ২৬ ওভারে বাংলাদেশ ৮ উইকেটে ৩৮ রানে পরিণত হয়।
নবম উইকেটটি তুলে নেন প্যাট কামিন্স। তার শর্ট বলে বড় শট খেলতে গিয়ে স্কয়ার লেগ ফিল্ডারের কাছে ক্যাচ দেন তাসকিন আহমেদ। ৭ বলে মাত্র ১ রান করে ফেরেন তাসকিন। ফলে মাত্র ৩৯ রানেই ৯ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ যখন দিশেহারা, তখন ক্রিজে ছিলেন তাইজুল ইসলাম ও শরিফুল ইসলাম।
নবম উইকেট পতনের পর এই দুই ব্যাটার মিলে ইনিংসের সেরা জুটি গড়েন। তারা দলীয় সংগ্রহকে ৫৫ রানে নিয়ে যান। দশম উইকেটে ২৫ রান যোগ করে নিজেদের ইনিংসের সর্বোচ্চ জুটি গড়েন তারা। এর আগে সপ্তম উইকেটে মিরাজ ও হাসান মাহমুদের ১৫ রান ছিল সর্বোচ্চ। শেষ পর্যন্ত নতুন স্পেলে ফিরে তাইজুল-শরিফুলের প্রতিরোধ ভেঙে দেন স্টার্ক। অফ স্টাম্পের বাইরে থেকে দূরে সরে যাওয়া বলে শট খেলতে গিয়ে কট বিহাইন্ড হন শরিফুল। ইনিংসের সর্বোচ্চ ১৪ রান করে ফেরেন তিনি। অন্যদিকে ২৬ বলে ১১ রান করে অপরাজিত থাকেন তাইজুল।
এর ফলে ৩৪ ওভারে মাত্র ৬৪ রানেই অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। ম্যাচটিতে ১০ ওভারে ৬ মেডেনসহ মাত্র ১২ রান দিয়ে ৬ উইকেট নিয়ে বিধ্বংসী রূপ দেখান মিচেল স্টার্ক। এছাড়া প্যাট কামিন্স ৩টি এবং জশ হেজেলউড ১টি উইকেট শিকার করেন।















