সুরমা চা বাগানে ৫০ বছরের জরাজীর্ণ সেতু: জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাফেরা, প্রশাসনের উদাসীনতায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার সুরমা চা বাগান এলাকার হাজারো মানুষের জীবনযাত্রা এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। একদিকে অর্ধশতাব্দীর পুরনো এক জরাজীর্ণ সেতু, অন্যদিকে ধসে পড়া সংযোগ সড়ক— এই দুইয়ের মাঝে আটকা পড়ে জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রায় ৫০ বছর আগে নির্মিত এই সেতুটি দীর্ঘদিনের অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং একটি ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের সংস্কার কাজ না হওয়ায় এই সেতুতে ভারী যানবাহন চলাচল তো অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে, এমনকি ছোট গাড়ি বা ভ্যান চলাচলেও এখন চরম ঝুঁকি থাকে। ফলে প্রতিদিন চা শ্রমিক, স্কুলগামী কোমলমতি শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় সাধারণ অধিবাসীদের এই ভাঙা সেতু দিয়েই যাতায়াত করতে হচ্ছে, যা তাদের জন্য প্রতিদিনের এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
বাঁশ-কাঠের তালি দিয়ে আর কতদিন: সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুটির দুই পাশের মাটি মারাত্মকভাবে ধসে গেছে এবং সংযোগ সড়কের একটি বড় অংশ ভেঙে সরাসরি খালের ভেতর নেমে পড়েছে। স্থায়ী কোনো সমাধান না পেয়ে এবং প্রশাসনের দীর্ঘ নীরবতার মুখে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের জীবন বাঁচাতে বাঁশ, কাঠ ও টিনের টুকরো দিয়ে অস্থায়ীভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ সচল রাখার চেষ্টা করছেন। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, খালের পাড়ে নেওয়া এই সাময়িক ব্যবস্থাগুলো আগামী বর্ষার ভারী বৃষ্টিতে বা পাহাড়ি ঢলে যেকোনো মুহূর্তে ভেসে যেতে পারে। বর্ষা মৌসুমে যখন অতিবৃষ্টিতে পানির স্তর বৃদ্ধি পায়, তখন এই এলাকাটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
সেতুটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় কেবল সাধারণ মানুষের যাতায়াতই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং চা বাগান থেকে সংগৃহীত পাতা পরিবহন, কৃষিপণ্য বাজারে আনা-নেওয়া এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য অ্যাম্বুলেন্স বা গাড়ির যাতায়াত মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যা প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মানকে আরও নিচে নামিয়ে দিচ্ছে।
ভুক্তভোগী ও বাগান কর্তৃপক্ষের আকুতি: সুরমা চা বাগানের ব্যবস্থাপক বাবুল সরকার অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানান, "সেতুটি অনেক পুরোনো হওয়ায় এখন আর কোনো ভারী যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। এর ফলে চা পাতা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহনে আমরা প্রতিনিয়ত মারাত্মক সমস্যায় পড়ছি। আমরা বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি; এই এলাকার যোগাযোগ সচল রাখতে অবিলম্বে একটি নতুন ও মজবুত সেতু নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি।"
অন্যদিকে, চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে চা শ্রমিক রাজীবর গোয়ালা বলেন, "বছরের পর বছর ধরে আমরা এই ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে জীবন বাজি রেখে চলাচল করছি। আকাশ মেঘলা হলেই আমাদের মনে আতঙ্ক দানা বাঁধে, কারণ বৃষ্টি নামলেই এই নড়বড়ে সেতুটি ধসে পড়ার ভয় থাকে। বিশেষ করে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর সময় মন সবসময় ভয়ে থাকে। কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন মালামাল নিতে হয়, কিন্তু এই ভাঙা সেতুর কারণে আমাদের কষ্ট আর শেষ হয় না। সরকারের কাছে কতবার আবেদন জানালাম, কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলো না।"
শ্রমিক নেতা প্রদীপ কৈরি আক্ষেপ করে জানান, স্বাধীনতার পর থেকে তারা কেবল আশ্বাসের বাণীই শুনে আসছেন। প্রতিবারই বলা হয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু বাস্তবে পুনর্নির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বছরের পর বছর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথে চলাই যেন তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আশ্বাসেই কি মিলবে সমাধান: এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী রেজাউল নবী জানান, "সেতুটির বেহাল দশা সম্পর্কে আমরা অবগত আছি এবং ইতিমধ্যে এলাকাটি পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান বলেন, "সুরমা চা বাগান এলাকার জন্য এই সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগাযোগ মাধ্যম। স্থানীয়দের দাবির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।"
কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে কখন: বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চা শিল্প, আর সেই শিল্পের সাথে জড়িত সুরমা চা বাগান এলাকার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা এখন অপরিহার্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, অবিলম্বে যদি নতুন সেতু নির্মাণের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এবং হাজার হাজার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। এখন প্রশ্ন জাগে, সাধারণ মানুষের জীবন কি কেবল দাপ্তরিক ফাইলের আর বরাদ্দের অপেক্ষায় ঝুলে থাকবে?









