কলম্বিয়ার রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সূচনা করেছেন সাবেক প্রাপ্তবয়স্ক চলচ্চিত্র অভিনেত্রী দেইসি আলেখান্দ্রা ওমানিয়া ওরতিজ়, যিনি বিনোদন জগতে ‘আমারান্তা হাঙ্ক’ নামেই অধিক পরিচিত। গত মার্চের সংসদীয় নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন অর্জন করে তিনি জয়ী হন এবং গত ২০ জুলাই কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতায় সিনেটর হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। বামপন্থী রাজনৈতিক জোট 'হিস্টোরিক প্যাক্ট'-এর প্রতিনিধি হিসেবে ৩৩ বছর বয়সী এই রাজনীতিক আগামী চার বছর নর্তে দে সান্তান্দের অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করবেন। নিউইয়র্ক পোস্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে তার এই রাজনৈতিক উত্থানের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে।

পেশাজীবনে নাটকীয় মোড় এবং চড়াই–উতরাইয়ের এক অনন্য গল্প বয়ে আনেন দেইসি আলেখান্দ্রা ওমানিয়া ওরতিজ়। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার একজন উদীয়মান বামপন্থী রাজনীতিক হিসেবে তিনি বর্তমানে দেশ ও বিদেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। কলম্বিয়ার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বোগোতায় গত সোমবার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বামপন্থী রাজনৈতিক দল ‘হিস্টোরিক প্যাক্ট ফর কলম্বিয়া’-র হয়ে সিনেটর পদে শপথ নেন তিনি। তবে তার এই রাজনৈতিক যাত্রার আগে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবন। ২০১৭ সালে সাংবাদিকতা পেশা ত্যাগ করে তিনি প্রবেশ করেন প্রাপ্তবয়স্কদের চলচ্চিত্র জগতে। সেখানে তিনি ‘আমারান্তা হাঙ্ক’ ছদ্মনামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তবে খ্যাতির মোহ ধরে না রেখে বছর দুয়েকের মধ্যেই তিনি সেই জগত ছেড়ে রাজপথের রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন এবং নিজেকে একজন পুরোদস্তুর রাজনীতিক হিসেবে গড়ে তোলেন।

সিনেটে প্রবেশের পর দেইসির প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদনশিল্পে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সামাজিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা। তিনি মনে করেন, এই খাতের কর্মীরা বিভিন্ন কোম্পানি ও এজেন্সির দ্বারা চরম শোষণের শিকার হন, যার বিপরীতে তাদের জন্য শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা থাকা অপরিহার্য। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, সিনেটর হিসেবে তিনি এই খাতের কর্মীদের জন্য সুস্পষ্ট শ্রমনীতি প্রণয়ন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং আইনি সুরক্ষার জন্য জোরালো পদক্ষেপ নেবেন। এর পাশাপাশি নারীর অধিকার রক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং সামাজিকভাবে প্রান্তিক ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

অবশ্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই তার অতীত পেশাকে সামনে এনে বিরোধীরা তীব্র সমালোচনা শুরু করে। তবে সেই সমালোচনার মুখে দমে না গিয়ে দেইসি পাল্টা প্রশ্ন তোলেন—একজন নারী প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদনশিল্পে কাজ করেছেন বলে তিনি কি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার স্বপ্ন দেখার অধিকার হারান? এই যুক্তির স্বপক্ষে তিনি ইতালির সাবেক আইনপ্রণেতা ইলোনা স্ট্যালারের উদাহরণ টেনে আনেন। স্ট্যালার প্রথমে রেডিও উপস্থাপক এবং পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পেলেও পরে ইতালির পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

কলম্বিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘হিস্টোরিক প্যাক্ট’ অন্যতম প্রভাবশালী একটি জোট। দেশটির জাতীয় নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, সর্বশেষ সিনেট নির্বাচনে এই জোট মোট ভোটের ২২ দশমিক ৭২ শতাংশ অর্জন করে ২৫টি আসনে জয়লাভ করেছে। প্রায় ৪৪ লাখের বেশি ভোটারের সমর্থন পাওয়া এই জোটটি বর্তমানে দেশটির অন্যতম বৃহত্তম সংসদীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

কুকুটা শহরে জন্ম নেওয়া দেইসি জানিয়েছেন, তার আইনি কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে মানসিক স্বাস্থ্য এবং যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ। এক আবেগঘন ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে বৈষম্য, স্বাধীনতার লড়াই এবং গণ-অর্থনীতির প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে সাহায্য করেছে। আমি আমার অভিজ্ঞতালব্ধ যুক্তি দিয়ে আইন প্রণয়নের প্রতিটি বিতর্কে প্রান্তিক মানুষের দাবিগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সমস্যাটি হলো, সমাজ প্রাপ্তবয়স্কদের আধেয় বা কনটেন্ট গ্রহণ করতে দ্বিধা করে না, কিন্তু যখন সেই মানুষগুলো ক্ষমতার জায়গায় বসে কথা বলতে চায়, তখন সমাজ তা মেনে নিতে রাজি হয় না।’

বর্তমানে বামপন্থী সিনেটর দেইসি আলেখান্দ্রা মানসম্মত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিতে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যা কলম্বিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।