২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। তাঁর অভিযোগ, গুটিকয়েক ছাত্রনেতা নিজস্ব চিন্তা বা দেশীয় রাজনৈতিক মতামতের পরিবর্তে ‘বিদেশিদের প্রেসক্রিপশনে’ এই উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিলেন। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা নিয়ে তাঁর কঠোর সমালোচনা ব্যক্ত করেন।

আলোচনা সভায় নুরুল হক নুর বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তরুণ রাজনীতির যে গতিপ্রকৃতি দেখা গেছে, তা হতাশাজনক। তিনি বলেন, ‘ইন্টেরিম গভমেন্টের সময় আমরা দেখলাম, গুটিকয়েক ছাত্রনেতা যারা কিছুটা পরিচিত ছিলেন, তারা বিদেশিদের প্রেসক্রিপশনে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছেন। এই প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক মতামত নেওয়া হয়নি।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, উপদেষ্টা পরিষদের তালিকাটি আগে থেকেই তৈরি করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের কাছে পাঠানো হয়েছিল। নুরের দাবি, শুরুতে তালিকাটি ১২ জনের কথা বলা হলেও ধীরে ধীরে তা বর্তমান পর্যায়ে বৃদ্ধি করা হয়েছে।

তরুণ বিপ্লবীদের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যারা দেশ পুনর্গঠনের স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে নেমেছিল, তাদের একটি অংশকে করাপ্টেড বা দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়েছে। তিনি নির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘ডিসি অফিস এবং এসপি অফিসে কিছু তরুণকে এম্পাওয়ার করা হয়েছে। সেখানে বরাদ্দকৃত চাল, গম, ডাল ইত্যাদি সামগ্রীর বণ্টন ও ভাগবাটোয়ারা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের। এভাবে প্রতিবাদী ও সংগ্রামী তরুণদের, যারা দেশ পুনর্গঠনের কাজে অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করা হয়েছে।’

নুরুল হক নুরের মতে, তরুণদের এই কর্মকাণ্ডের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি হয়েছে এবং তারা ধীরে ধীরে এই নেতৃত্বের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তিনি টিএসসিতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘টিএসসিতে একজন বৃদ্ধ মানুষকে তার অবসরের টাকা নিয়ে যেতে দেখেছি। কিন্তু তার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেই তরুণদের কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষ হতাশ হয়ে পড়েছে।’ তিনি স্বীকার করেন যে, তিনি নিজেও সেই রাজনীতির একটি অংশ ছিলেন, তবে পরবর্তীতে একটি সংগঠনের মাধ্যমে ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পথ চলা শুরু করেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সব তরুণরা মিলে বাংলাদেশের রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করার যে আশা তিনি করেছিলেন, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

উপদেষ্টা হওয়ার পরিবর্তে তরুণদের ভূমিকা ভিন্ন হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন নুর। তাঁর মতে, যারা বর্তমানে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তারা যদি সরকারের ভেতরে না থেকে বাইরে থেকে একটি শক্তিশালী ‘প্রেশার গ্রুপ’ বা চাপ সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে কাজ করতেন, তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। তিনি বলেন, ‘তারা যদি বাইরে থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন এবং সংস্কারের প্রশ্নে জোরালো আওয়াজ তুলতেন, তবে দেশটা হয়তো একটি ভিন্ন ও ইতিবাচক দিকে যেতে পারত।’ বরং আন্দোলনের আবেগকে পুঁজি করে তরুণদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিকে চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়েছে, যা নতুন স্বপ্নের আশাকে হতাশায় পরিণত করেছে।

নিজের রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রামের কথা স্মরণ করে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানান, তিনি একটি অত্যন্ত নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। লোভ-লালসায় নিজেকে বিক্রি না করার দৃঢ় প্রত্যয় তাঁর দীর্ঘদিনের। তিনি বলেন, ‘নিজের ক্যারিয়ারের কী হবে, আমি বেঁচে থাকব কি থাকব না—এই হিসাব আমি কখনো করিনি। আমার বাবা গ্রামে ছোটখাটো ইউপি সদস্য ছিলেন। আমাকে মেডিকেল কোচিং করানোর জন্য তিনি কষ্ট করে জমি বিক্রি করে মাসে মাসে টাকা পাঠিয়েছিলেন।’

রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা চিন্তা না করে তিনি শেখ হাসিনার মতো কর্তৃত্ববাদী শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন বলে দাবি করেন। সেই সময়ে তাঁর পরিবারের সদস্যরা তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন ছিলেন। ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে গণভবনে আমন্ত্রণ জানান, তখন তাঁর বাবা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। নুরের স্মৃতিচারণে, ‘আমার বাবা আমাকে হাত ধরে কেঁদে বলেছিলেন—খালেদা জিয়ার মতো একজন নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে জেলে নিয়ে গেছে, বাবা তোরে তো শেষ করে ফালাইবে; তুই চিন্তা কর, প্রধানমন্ত্রী তোরে ডাকছে, তুই যা, তারপর কী করবি সেটা তুই ডিসিশন কর।’

সেই সময়ে তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য পরিবারের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। নুরুল হক নুর জানান, তৎকালীন এনএসআই (NSI) সদস্যরা তাঁর বাড়িতে এসে তাঁর বাবাকে বলেছিলেন, ‘আপনার ছেলেকে বুঝান, নাহলে ও শেষ হয়ে যাবে।’ তবে সেই কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি নিজের ক্যারিয়ার, পরিবার বা অর্থবিত্তের কথা চিন্তা করেননি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা বিন্দুমাত্র কম্প্রোমাইজ করি নাই। আমরা আন্দোলন করেছি এবং আপসহীনভাবে লড়াই করে এসেছি।’