দীর্ঘদিন ধরে চরম আর্থিক সংকট, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় থাকা বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির বর্তমান মালিকানা থেকে এস আলম গ্রুপকে সরিয়ে এবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের নাম সামনে আসছে। বিভিন্ন শেয়ারহোল্ডারের কাছ থেকে তিনি ইতোমধ্যে এক লাখের বেশি শেয়ার ক্রয় করেছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ হাজার শেয়ারের মালিকানা হস্তান্তরের আবেদন ইতিমধ্যে ব্যাংকের দপ্তরে জমা পড়েছে এবং প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শেয়ারের হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বাকি এক লাখ শেয়ার হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও বর্তমানে চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, মোট দুই লাখ শেয়ারের মালিকানা অর্জন করতে পারলে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ব্যাংকটির প্রকৃত মালিক হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবেন। তবে এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং খুদে বার্তারও কোনো জবাব দেননি।

অন্যদিকে, ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ এস আলমের ১৮টি প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা প্রায় ৪১.৮৬ শতাংশ শেয়ারের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র খুঁজে পাচ্ছে না। এই গুরুতর বিষয়টি ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছিল। যদিও বর্তমানে তা কমে প্রায় ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে, তবে এই পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতির লক্ষণ দেখা দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান এই বিষয়ে বলেন, ‘এস আলম গ্রুপের বেনামি ৪০ শতাংশ শেয়ারের কাগজপত্র কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা একাধিকবার চিঠি পাঠিয়েছি, কিন্তু কোনো হদিস মেলেনি। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এখন পুরো বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে নির্দেশনা দিবে, আমরা সেই অনুযায়ী পরবর্তীতে কার্যক্রম পরিচালনা করব।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রচলিত বিধান ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রচলিত ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা একক গোষ্ঠী একটি ব্যাংকের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে পারেন। তবে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে শেয়ার থাকলেই সেগুলোর প্রকৃত মালিকানা একজনের—এমনটি ধরে নিয়ে সরাসরি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, কোনো ব্যক্তি একাধিক বেনামি নামের মাধ্যমে একটি ব্যাংকে ৫০ শতাংশ বা তার বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন—এমন অভিযোগ থাকলেও, এর পেছনে একই ব্যক্তি বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর মালিকানা রয়েছে, তা দাফতরিক ও আইনগতভাবে প্রমাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বা বাংলাদেশ ব্যাংককে সংশ্লিষ্ট শেয়ারগুলোর সঙ্গে মূল ব্যক্তির আর্থিক ও মালিকানাগত সম্পর্কের সুস্পষ্ট ‘লিংকেজ’ প্রমাণ করতে হবে। মুখপাত্র আরও বলেন, বেনামি শেয়ারের সঙ্গে মূল ব্যক্তির সরাসরি যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন বা স্বার্থসংশ্লিষ্টতার যথাযথ প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত শেয়ার বাজেয়াপ্ত বা নিষ্পত্তির মতো পদক্ষেপ নেওয়া আইনি দিক থেকে অত্যন্ত জটিল। তবে তদন্তে যদি আইনগতভাবে প্রমাণিত হয় যে, বিভিন্ন নামে থাকা শেয়ারগুলোর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে এবং তারা নির্ধারিত ১০ শতাংশ সীমা অতিক্রম করেছে, তাহলে আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত শেয়ারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল হক বলেন, ‘এস আলমের বেনামি ১৮টি প্রতিষ্ঠানকে আমরা নোটিশ পাঠিয়েছি। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানও আমাদের চিঠি গ্রহণ করেনি; সবগুলোই ফেরত আসছে। এখন আদালতের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি দেখছি। আদালত যদি এই শেয়ারগুলো বাজেয়াপ্ত করে, তাহলে আমরা সেগুলো অন্য জায়গায় বিক্রির ব্যবস্থা করব।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রতিমন্ত্রী ইশরাক শেয়ার কিনেছেন কি না, এ বিষয়ে আমার এই মুহূর্তে জানা নেই। মূল কথা হচ্ছে, আমরা তো মালিকদেরই এখনো খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা প্রতিনিয়ত মালিকদের খোঁজার চেষ্টা করছি।’

ব্যাংকের বর্তমান মালিকানা কাঠামো অনুযায়ী, প্রায় ৫১ শতাংশ শেয়ার সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি মালিকানায় রয়েছে ৩৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ, সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের কাছে রয়েছে ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং সরকারি মালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যাংকবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ শেয়ার। বাকি প্রায় ৪৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে আমানতকারী ও অন্যান্য বেসরকারি শেয়ারহোল্ডারদের হাতে।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির প্রায় ৪০ শতাংশ শেয়ার বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, এমজিএইচ গ্রুপ ও আনোয়ার গ্রুপের হাতে ছিল। তবে ২০১৬ সালের শুরুতে এসব বেসরকারি শেয়ার অধিগ্রহণ করে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি, বাংলাদেশ কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড (বিসিআইএল) নামে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে এটি তফসিলি ব্যাংক হিসেবে 'বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড' নামে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করে।