আগামী বছরের নির্বাচনে চতুর্থ এবং শেষ মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তবে সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আগেই তার নেতৃত্ব এক চরম সংকটের মুখে পড়ে। বিশ্বকাপের মুনাফার একটি অংশ ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)’ নামক একটি বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিক্রির পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। এই পরিকল্পনার আওতায় সদস্য দেশগুলোর জন্যও লভ্যাংশ পাওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। তবে এই পদক্ষেপটি ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় তোলে এবং ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়।

বিতর্কিত এই পরিকল্পনা এবং এর ফলে সৃষ্ট সংকটের বিষয়ে ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে। মরক্কোয় অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে উপস্থিত শীর্ষ কর্মকর্তারা সভাপতি ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এই সমর্থনের মাধ্যমেই মূলত অভিশংসন বা পদচ্যুতির হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন ইনফান্তিনো। ফিফার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়, মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রম এবং রাবাতে উপস্থিত ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সদস্যরা ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের সংহতি জানিয়েছেন। সেখানে স্বীকার করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক পরিকল্পনাটি পরিচালনা করার ক্ষেত্রে কিছু ভুল হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি আরও ভিন্ন ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা উচিত ছিল।

এই ভুলের জন্য ফিফা কাউন্সিল এবং সদস্য দেশগুলোর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে এই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রমের সমর্থনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, এর কিছুদিন আগে তিনি প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মীদের পাঠানো এক ই-মেইলে গত সপ্তাহের ঘটনাগুলোকে ‘দুঃখজনক ও নিন্দনীয়’ বলে অভিহিত করেছিলেন এবং ইনফান্তিনোর বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে ফিফার দাবি, ইনফান্তিনোও তার মহাসচিবের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

পাশাপাশি, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিকীকরণ সংক্রান্ত সেই বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে চূড়ান্তভাবে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি স্পষ্ট করেছে ফিফা। সংস্থাটি জানিয়েছে, এফএফই প্রস্তাবটি এখন ‘সম্পূর্ণভাবে বাতিল’ করা হয়েছে। ফিফার মতে, এই পুরো অভিজ্ঞতা থেকে তাদের শিক্ষা নেওয়ার বিষয় রয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আরও উন্নত ও স্বচ্ছ করা হবে।

তবে ফিফার এই অভ্যন্তরীণ সমঝোতা সত্ত্বেও বহির্ভূত চাপ কমেনি। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর সংগঠন ‘ইউরোপিয়ান লিগস’—যার সদস্যদের মধ্যে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা এবং সিরি আ-র মতো প্রভাবশালী লিগগুলো রয়েছে—তারা ফিফার বর্তমান শাসনব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, এফএফই প্রস্তাবটি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এটি ফিফার সামগ্রিক পরিচালনা পদ্ধতি, অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ফুটবলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সব অংশীজনের আনুষ্ঠানিক ভূমিকা নিশ্চিত করতে এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন ফিফার শাসনব্যবস্থার সংস্কার।

শুধু তাই নয়, ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের সম্ভাবনার বিষয়েও তীব্র বিরোধিতা করেছে ইউরোপিয়ান লিগস। তারা মনে করে, ফিফাকে আর একতরফাভাবে ফুটবলের স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য বিঘ্ন সৃষ্টি করতে দেওয়া যাবে না। সংগঠনটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যতক্ষণ না শাসনব্যবস্থার যথাযথ সংস্কার সম্পন্ন হচ্ছে, ততক্ষণ ফিফার যেকোনো নতুন প্রতিযোগিতা চালু বা বিদ্যমান প্রতিযোগিতার সম্প্রসারণের প্রস্তাব তারা প্রত্যাখ্যান করবে।