সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ব্যাংক হিসাবের যাবতীয় লেনদেনের তথ্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিট বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-তে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। তদন্তের আওতায় রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তাঁর ছেলে শাফি মোদাচ্ছের খান, সাবেক পিএস ও অতিরিক্ত সচিব হারুন অর রশিদ বিশ্বাস, যুগ্মসচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোল্লা ইব্রাহিম হোসেন, সহকারী একান্ত সচিব মনির হোসেন এবং জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ অপুসহ মোট ৮ জন।

দুদকের প্রধান কার্যালয়ের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে এসব তথ্য জানা গেছে। গত বছরের ২১ আগস্ট এই চিঠি পাঠানো হলেও, এর আগে ১৫ আগস্ট সংস্থার প্রধান কার্যালয় থেকে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে নিশ্চিত করেছেন দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম। দুদকের ঊর্ধ্বতন সূত্রগুলো জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা সমস্ত লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণ চাওয়া হয়েছে, যাতে তাদের সম্পদের উৎস এবং অবৈধ অর্থ পাচারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা যায়।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আসাদুজ্জামান খান কামাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই এক সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাপক আকারে ঘুষ ও অর্থ আত্মসাতের প্রক্রিয়ায় লিপ্ত ছিলেন। বিশেষ করে পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলো থেকে বস্তায় বস্তায় টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল কারিগর ছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ড. হারুন অর রশীদ বিশ্বাস। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটে যুক্ত ছিলেন যুগ্মসচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস, মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মনির হোসেন, জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ অপু এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোল্লা ইব্রাহিম হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটটি হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এমনকি ড. হারুন অর রশীদ অবসরে যাওয়ার পরও মন্ত্রণালয়ের ভেতর ঘুষ ও দুর্নীতির নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতেই ছিল। ধরা পড়ার ঝুঁকি এড়াতে এই অবৈধ অর্থের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে বলে দুদকের প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে।

তদন্তে আরও জানা গেছে, জেলায় পুলিশ সুপার (এসপি) নিয়োগের ক্ষেত্রে এই সিন্ডিকেটটি সর্বনিম্ন ৮০ লাখ থেকে শুরু করে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত দাবি করত। এই চক্রের আশীর্বাদ ছাড়া পুলিশের কোনো কর্মকর্তাই গুরুত্বপূর্ণ পদে বা পছন্দের জেলায় পদায়ন পেতেন না। বিশেষ করে জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে নিয়োগ পেতে এক থেকে তিন কোটি টাকা লেনদেনের প্রচলন ছিল। একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে ডিআইজি মোল্ল্যা নজরুল ইসলামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২২ সালের ৩০ জুন তিনি গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। অভিযোগ রয়েছে, এই পদের বিনিময়ে তিনি মোট পাঁচ কোটি টাকা প্রদান করেন। প্রথমে হারুন অর রশীদ বিশ্বাসের কাছে পাঁচ কোটি টাকার একটি চেক দেন তিনি। পরবর্তীতে কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর হোটেল ওয়েস্টিনে হারুন রশীদের কাছে নগদ দুই কোটি টাকা হস্তান্তর করেন। সেই সময় পূর্বের চেকটি ফেরত নিয়ে মোল্ল্যা নজরুল তিন কোটি টাকার একটি নতুন চেক প্রদান করেন এবং বাকি টাকাও পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বস্তায় ভরে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ফার্মগেটে অবস্থিত বাসভবনে পৌঁছে দেওয়া হতো বলে জানা গেছে।

দুর্নীতির এই জাল কেবল পুলিশ বিভাগে সীমাবদ্ধ ছিল না, এনজিওগুলোর ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ বা ‘এনওসি’ প্রদানের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো। প্রতিটি সংস্থা থেকে ৮০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত দাবি করা হতো। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে রাজধানীর উত্তরার একটি উন্নয়ন সংস্থা এনওসি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর বিপাকে পড়ে। পুলিশ বিশেষ শাখা, জেলা প্রশাসক এবং এনএসআই-এর ইতিবাচক প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও অকারণে ফাইলটি মন্ত্রণালয়ে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে মন্ত্রীকে ৮৫ লাখ টাকা দেওয়া হলে ফাইলটি অনুমোদিত হয়। এই টাকার ব্যাগটি ফার্মগেট এলাকায় কামালের বাসার সামনে তাঁর পরিবারের এক সদস্যের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল।

এছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই সিন্ডিকেটের ব্যাপক প্রভাব ছিল। কোনো সার্কুলার প্রকাশিত হলে মন্ত্রীর দপ্তর থেকে একটি নির্দিষ্ট তালিকা পাঠানো হতো এবং সেই তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করা হতো। ২০২৩ সালের ২ অক্টোবর ৫৩৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যার মধ্যে ৪৩৬ জন পুরুষ ফায়ার ফাইটার, ১৫ জন নারী ফায়ার ফাইটার ও ৮৪ জন গাড়িচালক ছিলেন। নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরুতেই মন্ত্রীর দপ্তর থেকে ২৫০ জনের একটি তালিকা মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয় এবং সেই নির্দেশ মেনে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগের বিনিময়ে জনপ্রতি ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে কামাল-হারুন সিন্ডিকেট। বর্তমানে দুদকের এই তদন্তের মাধ্যমে এই বিশাল দুর্নীতির প্রকৃত পরিধি এবং অর্থের গতিপথ বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।