আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের বিল উত্থাপন হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির আহ্বায়ক সালাউদ্দিন আহমদ। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের গণমাধ্যম সেন্টারে সংবিধান সংশোধন কমিটির তৃতীয় সভা শেষে সাংবাদিকদের দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, প্রস্তাবিত এই সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হবে। তবে এই পরিবর্তনগুলো কেবল সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে জনগণের মতামত বা গণভোটের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ, বিল পাসের পর চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে সাধারণ জনগণের সম্মতির জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

এদিনের সভায় জাতীয় দৈনিকগুলোর সম্পাদক এবং অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময় করেছে বিশেষ কমিটি। ব্রিফিংকালে সালাউদ্দিন আহমদ জানান, বিভিন্ন জার্নালিস্ট ফোরামের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যারা সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন তফসিল এবং বিশেষ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বিষয়ে তাদের মূল্যবান মতামত ও প্রস্তাবনা পেশ করেছেন। অনেক সাংবাদিক তাদের মতামত লিখিত আকারে জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। কমিটির আহ্বায়ক জানান, এই আলোচনা ও প্রস্তাবনাগুলো সংকলিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এবং পুস্তিকা আকারে প্রণয়ন করা হবে।

সংবিধান সংশোধনের এই স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকদের অনেকেই বিরোধী দলের সদস্যদের এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। সরকার ও কমিটি এই প্রস্তাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। তিনি বলেন, "আমরা বিরোধী দলগুলোকে বারবার আহ্বান জানিয়েছি এবং এখনো জানাচ্ছি। তারা যদি এই কমিটিতে যোগ দেন, তবে আমরা তাদের স্বাগত জানাব।" তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, জাতীয় স্বার্থে এই প্রক্রিয়ায় কোনো বিভক্তি থাকা উচিত নয় এবং সর্বসম্মত ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন।

গণভোটের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সালাউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন, ৫ আগস্টের ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানের পর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী বাতিল হয়ে যাওয়ায় ১৪২ অনুচ্ছেদটি পুনরায় কার্যকর বা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। এখন সংবিধানের প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮, ৫৬ এবং ১৪২-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিশেষ অনুচ্ছেদগুলোতে যেকোনো পরিবর্তন আনতে হলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে অবশ্যই গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় নিতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সুরক্ষায় গণভোটের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি জানান, বিএনপির পক্ষ থেকে একটি বিশেষ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘ ১৭ বছর সংগ্রাম করেছে। তাই ভবিষ্যতের কোনো সংসদ যেন সহজে এই ব্যবস্থা বাতিল করতে না পারে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলোতে সংশোধনী আনতে হলে অবশ্যই গণভোটের প্রয়োজন হবে—এমন একটি বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে তারা।

সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। তবে এর পাশাপাশি নির্বাচনের ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং যে ম্যান্ডেট পাওয়া গেছে, সেগুলোর যথাযথ প্রতিফলন ঘটবে সংবিধানে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রস্তাবনায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে অনুচ্ছেদ ৮-এ যে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাটি যুক্ত করেছিলেন, তা ফিরিয়ে আনা হবে। এটি তাদের ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি।

সংশোধন প্রক্রিয়ার সময়সীমা সম্পর্কে কমিটির আহ্বায়ক জানান, ডিসেম্বরের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। ওই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই আইন মন্ত্রণালয় একটি বিল প্রস্তুত করবে। আশা করা হচ্ছে, আগামী জানুয়ারির প্রথম অধিবেশনে বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হবে। এরপর সংসদীয় আলোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনী শেষে বিলটি পাস হবে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য গণভোটের আয়োজন করা হবে। সবশেষে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যম ও সম্পাদকদের মাধ্যমে আবারও বিরোধী দলগুলোকে এই ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানান।