চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক প্রভাবশালী নেতা এবং তার সহযোগীদের দ্বারা পরিচালিত এক ভয়াবহ ‘হানিট্র্যাপ’ চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এই চক্রের পাতা ফাঁদে পড়ে চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীসহ সমাজের শীর্ষস্তরের বেশ কয়েকজন ব্যক্তি। গোপন ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার এই রহস্যময় কর্মকাণ্ড সম্প্রতি সরকারের একটি দায়িত্বশীল সংস্থার বিশেষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকাশ্যে এসেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই পুরো চক্রের মূল হোতা হলেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের ছৈয়দাবাদ এলাকার বাসিন্দা জোবাইরুল হক জিয়ান (৩১)। তিনি উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক শিক্ষা ও পাঠচক্রবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জিয়ানের modus operandi বা অপরাধ করার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও ধূর্ত। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দরী নারীদের ছবি এবং পরিচয় ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করতেন। এসব প্রোফাইলের মাধ্যমে তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রলুব্ধ করতেন এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। একবার বিশ্বাস অর্জন করতে পারলে, তিনি কৌশলে তাদের ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর মুহূর্তের গোপন ভিডিও ধারণ করতেন। পরবর্তীতে সেই ভিডিওগুলো প্রকাশের হুমকি দিয়ে তিনি ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে অর্থ আদায় কিংবা প্রশাসনিক সুবিধা গ্রহণ করতেন। জানা গেছে, প্রায় এক দশক ধরে তিনি এই প্রতারণার জাল বুনে আসছিলেন, যার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন মূলত ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনৈতিক নেতা এবং পুলিশ কর্মকর্তারা।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, জিয়ানের এই প্রতারণার প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হতো। প্রথম ধাপে তিনি সুন্দরী নারীদের ছবি সংগ্রহ করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলতেন। এরপর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে টার্গেট করা ব্যক্তির কাছে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতেন। প্রাথমিক আলাপচারিতা ফেসবুক মেসেঞ্জারে শুরু হলেও, সম্পর্ক কিছুটা ঘনিষ্ঠ হলে তিনি কথোপকথন হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের মতো নিরাপদ এবং এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মে সরিয়ে নিতেন। সেখানে বিভিন্ন অ্যাপের সাহায্যে নারীকণ্ঠে কথা বলে এবং অডিও-ভিডিও কলের মাধ্যমে তিনি তার শিকারকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করতেন। পরিচয় গোপন রাখতে তিনি নিজেকে কখনো চট্টগ্রামের পরিচিত কোনো তরুণী বা মডেল হিসেবে, আবার কখনো এক সন্তানের মা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারী হিসেবে উপস্থাপন করতেন, যাতে টার্গেট করা ব্যক্তিরা সহানুভূতি অনুভব করেন এবং দ্রুত ঘনিষ্ঠ হন।

এই চক্রের সবচেয়ে বড় শিকার হিসেবে সামনে এসেছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজ। তদন্তে দেখা গেছে, তৎকালীন পাহাড়তলী থানার ওসি এবং বর্তমান ডিবি কর্মকর্তা বাবুল আজাদের মাধ্যমেই জিয়ানের সাথে মডেল সানজিদা ইসলাম সায়মার পরিচয় ঘটে। বাবুল আজাদ অত্যন্ত চতুরতার সাথে সানজিদাকে নিজের ‘শ্যালিকা’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে তৎকালীন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে জিয়ান সানজিদা ইসলাম সায়মার নামে একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলেন এবং কমিশনারকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান। এরপর মেসেঞ্জার, অডিও কল এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ চলতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে, সায়মার পরিচয় ব্যবহার করে পর্দার আড়ালে সব নিয়ন্ত্রণ করছিলেন জিয়ান নিজেই।

তদন্তকারী সংস্থা হাসিব আজিজের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যবহৃত তিনটি মোবাইল নম্বর এবং চারটি সংবেদনশীল ভিডিও উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে একটি ভিডিওর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সানজিদা ইসলাম সায়মার একটি ফেসবুক লাইভ থেকে ১৫ সেকেন্ডের অংশ কেটে নিয়ে ভিডিও কলে চালানো হয়েছিল, যাতে অপর প্রান্তের ব্যক্তিটি মনে করেন তিনি প্রকৃত সায়মার সাথে কথা বলছেন। ২০২৫ সালের শুরু থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত চলা এই ভার্চুয়াল যোগাযোগের চারটি ভিডিওর একটিতে সাবেক কমিশনারকে আপত্তিকর অবস্থায় এবং বাকি তিনটিতে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। হাসিব আজিজ তিনটি ভিডিওর সত্যতা স্বীকার করলেও, একটি ভিডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে তিনি ‘হানিট্র্যাপ’-এ পড়েছিলেন, তবে পরিচয় ভুয়া জানার পর তিনি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন এবং অ্যাকাউন্টটি ব্লক করে দেন। তার দাবি, এই চক্র তাকে দিয়ে কোনো অনৈতিক কাজ করাতে পারেনি।

তবে তদন্তের গভীরে গিয়ে জানা গেছে, হাসিব আজিজের এই ব্যক্তিগত ভিডিওগুলো ছিল জিয়ান এবং তার সহযোগীদের হাতে এক শক্তিশালী অস্ত্র। এই ব্ল্যাকমেইলের ভয় দেখিয়ে সিএমপির বিভিন্ন থানার ওসি পদায়ন এবং বদলির ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলতেন জিয়ান ও দুই পুলিশ কর্মকর্তা—বাবুল আজাদ এবং জাহেদুল ইসলাম। কোনো নির্দিষ্ট থানায় কাকে ওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে বা কাকে সরিয়ে দেওয়া হবে, সেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো মূলত এই চক্রের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হতো। বদলি বা পদায়নের দেনদরবার চূড়ান্ত হওয়ার পর জিয়ান সরাসরি সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজকে ফোন করে কাঙ্ক্ষিত অফিস আদেশ আদায়ের চাপ দিতেন। সিএমপির তৎকালীন অনেক কর্মকর্তা এই চক্রের কথা জানলেও, নিজেদের গোপন ভিডিও ফাঁস হওয়ার ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাননি।

হাসিব আজিজ চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে এপিবিএন-এ যোগ দেওয়ার পর সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাটি এই অনুসন্ধান শুরু করে। জিয়ানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ, সংবেদনশীল ভিডিও এবং গোপন নথি পাওয়া গেছে। তদন্তে আরও দেখা গেছে, জাহেদুল ইসলামকে কর্ণফুলী থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করার বিষয়টি আগেই একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছিল। পদায়ন সম্পন্ন হওয়ার পর জিয়ানের সাথে জাহেদুল ইসলামের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওসি জাহেদুল জিয়ানকে একটি দামী আইফোন উপহার দেন এবং নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে তাকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যেতেন। জিয়ানের ফেসবুক প্রোফাইলে ওসির গাড়িতে চড়ে কর্ণফুলী টানেল পার হওয়ার ছবিও পাওয়া গেছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে পাঁচলাইশ থানার বর্তমান ওসি জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘পরিচিতদের সাথে পরিচয় হওয়া স্বাভাবিক। কে কখন কীভাবে আমার পরিচয় ব্যবহার করেছে, তা আমি জানি না।’ অন্যদিকে, ডিবি কর্মকর্তা বাবুল আজাদ দাবি করেন, তার সাথে জিয়ানের সখ্যতার কোনো প্রমাণ নেই এবং প্রকৃত ভুক্তভোগী মডেলের সাথে কথা বললে সত্য বেরিয়ে আসবে। বর্তমান সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানান, তিনি এই বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি।

জিয়ানের এই প্রতারণার জাল ছিল অবিশ্বাস্য রকমের বিস্তৃত। তদন্তে তার সাথে সংশ্লিষ্ট মোট ৫৪টি নারী পরিচয়ের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি ‘জান্নাতুল মনি’ এবং ‘জান্নাতুল নাইমা’র মতো ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলেছিলেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জিয়ান বর্তমান একজন প্রতিমন্ত্রী, একজন সংসদ সদস্য, ডজনখানেক রাজনৈতিক নেতা এবং পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে অনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। চট্টগ্রাম পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জিয়ানকে গ্রেপ্তার করতে জেলা পুলিশ সোর্স নিয়োগ করে নজরদারি বাড়ালেও, এক পর্যায়ে বর্তমান একজন প্রতিমন্ত্রীর ফোন আসার পর পুলিশি তৎপরতা থমকে যায়। সরকারি তদন্ত সংস্থাটি সাবেক কমিশনারের বিষয়ে বিস্তারিত জানালেও, অন্যান্য রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে কোন প্রতিমন্ত্রী জিয়ানের হয়ে সুপারিশ করেছেন, তা এখনো রহস্য হয়ে আছে, যদিও পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে এটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

জোবাইরুল হক জিয়ানের অপরাধের ইতিহাস দীর্ঘ। ২০২০ সালের ২৯ মে সাতকানিয়া থানা পুলিশ তাকে প্রথম গ্রেপ্তার করেছিল। তখন অভিযোগ ওঠে, তিনি জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ের ছবি ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং অর্থ দাবি করেছিলেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতাদের সাথে নারীকণ্ঠে কথা বলে ঘনিষ্ঠতা তৈরির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর সময় তিনি আবারও গ্রেপ্তার হন। সে সময়ও ভুয়া নারী পরিচয়ে ব্ল্যাকমেইল এবং মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার নাম করে টাকা আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। বারবার গ্রেপ্তারের পরও জিয়ানের অপরাধের পরিধি কেবল রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়িয়ে পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

এই চক্রের কারণে অনেক নির্দোষ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সাতকানিয়া পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর রাসেল উদ্দিন জানান, জিয়ানের অপকর্মের কথা পুলিশের কাছে জানালে এবং প্রতিবাদ করলে ওসি বাবুল আজাদের নির্দেশে তাকে অন্যায়ভাবে আটক করা হয় এবং দুটি মামলায় গ্রেপ্তার করে আড়াই মাস জেলে রাখা হয়। অন্যদিকে, নিজের নাম ও ছবি ব্যবহারের কথা জানতে পেরে মডেল সানজিদা সায়মা পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। তিনি বলেন, তার পরিচয় ব্যবহার করে পুলিশ কর্মকর্তার সাথে অপকর্ম করা হয়েছে, যা তার চরম মানহানির কারণ। তিনি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

সব অভিযোগের মুখে অভিযুক্ত জোবাইরুল হক জিয়ান সবকিছু অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, এটি তার পারিবারিক দ্বন্দ্বের ফল এবং এক পক্ষ তাকে নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই এবং সিএমপি কমিশনারের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তি চাইলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতেন, যা তিনি করেননি। তবে সংগৃহীত প্রমাণ এবং তদন্ত প্রতিবেদন জিয়ানের এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে একটি অপরাধী চক্র কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল, এই ঘটনাটি তারই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।