পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান খান মনির খান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। বুধবার (৫ আগস্ট) বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে তার জীবনাবসান ঘটে। মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন তার হাতে হাতকড়া পরা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন ও সমালোচনার সৃষ্টি করে।

মনির খানের পরিবারের সদস্যদের দাবি, ওই বিতর্কিত ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে থাকা সবকটি মামলায় জামিন মঞ্জুর করা হয়। তবে শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হওয়ায় তিনি আর সুস্থ হয়ে কারাগার বা হাসপাতাল থেকে মুক্তি পাননি। অবশেষে মৃত্যুর মাধ্যমেই তার দীর্ঘ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার অবসান ঘটে, যা স্বজনদের কাছে তার 'স্থায়ী মুক্তি' হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

মৃত মিজানুর রহমান মনির খান পটুয়াখালী সদর উপজেলার বহালগাছিয়া গ্রামের প্রয়াত আব্দুল খালেক খানের পুত্র। রাজনৈতিক জীবনে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি পটুয়াখালী সদর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় ফেডারেশনের সহ-সভাপতি হিসেবেও তিনি দীর্ঘকাল কাজ করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি আত্মগোপন করে ছিলেন। দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার পর ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টু রোড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ঢাকায় ৬টি এবং পটুয়াখালী সদর থানায় ২টিসহ মোট ৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। প্রায় ১১ মাস ধরে ঢাকা ও পটুয়াখালী কারাগারে বন্দি থাকার পর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন মামলায় শোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে তাকে আটক রাখা হয়।

মনির খানের সাথে তার স্ত্রী মোসাম্মদ সালমা জাহানও কারাবন্দি ছিলেন। তিনি পটুয়াখালী সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। স্ত্রী সালমা জাহান জানান, গত ৯ই জুন কারাগারে থাকা অবস্থায় মনির খান হঠাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত রোগে (স্ট্রোক) আক্রান্ত হন। তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে তাকে কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অবস্থার আরও আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠায় ১৪ই জুন তাকে ঢামেক হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের আইসিইউতে ভর্তি করা হয় এবং এর দুদিন পর থেকে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।

প্রায় দুই মাস আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করার পর বুধবার বিকেলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সালমা জাহান আরও জানান, আইসিইউতে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকাকালীন ৩০ জুলাই তার সর্বশেষ মামলাটিতে আদালত জামিন মঞ্জুর করেন। এর আগেই তিনি বাকি সাতটি মামলায় জামিন পেয়েছিলেন। আইসিইউতে থাকা অবস্থায় হাতকড়া পরা ছবি ভাইরাল হওয়ার পর তীব্র বিতর্কের মুখে পুলিশ শেষ পর্যন্ত তার হাতকড়া খুলে দিয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে তার স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছিল।

মৃতের চাচা আবদুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার পটুয়াখালী সদর উপজেলা মাঠ প্রাঙ্গণে জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।