যেকোনো দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির জীবন রক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি সকল হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দ্রুত সার্কুলার জারির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ সংশোধন করে আহতদের নিকটস্থ হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসার আইনি বিধান সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি এবং বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই যুগান্তকারী রায় প্রদান করেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, যাকে সহায়তা করেন আইনজীবী সঞ্জয় মণ্ডল ও নাসরিন সুলতানা। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ জিসান হায়দার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী কাজী এরশাদুল আলম এবং সালাউদ্দিন হাসপাতালের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান আদালতে সওয়াল-জবাব করেন।

এই মামলার প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ২০১৮ সালের ২৬ জানুয়ারি রাজধানীর সায়দাবাদ এলাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে গুরুতর আহত হন খুলনার সোনাডাঙ্গার মোটর পার্টস ব্যবসায়ী ইব্রাহিম। তাকে দ্রুত নিকটস্থ সালাউদ্দিন হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তৃপক্ষ তাকে সেখানে চিকিৎসা প্রদান না করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেয়। দুর্ভাগ্যবশত, হাসপাতালে স্থানান্তরের পথে চিকিৎসার অভাবে ইব্রাহিমের মৃত্যু হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর জনস্বার্থে 'হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ' (এইচআরপিবি) একটি রিট পিটিশন দায়ের করে। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি আদালত এই রিটের প্রেক্ষিতে রুল জারি করেন এবং দীর্ঘ শুনানি শেষে আজ চূড়ান্ত রায় প্রদান করা হয়।

আদালতের রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অবিলম্বে একটি সার্কুলার জারি করতে হবে, যাতে দেশের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা দিতে বাধ্য থাকে। এছাড়া সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর বিধিতে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের নিকটস্থ হাসপাতালে চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শুনানির সময় আইনজীবী মনজিল মোরসেদ যুক্তি দেন যে, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জীবন ধারণ বা বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক দুর্ঘটনায় আহত রোগীকে ফিরিয়ে দিতে পারে না। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে এভাবে মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয় এবং এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

ভিকটিমের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে আদালত পর্যবেক্ষণে জানান, সালাউদ্দিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে। তবে ক্ষতিপূরণের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণের জন্য একটি নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তাই এই রায়ে সরাসরি ক্ষতিপূরণের আদেশ না দিলেও, আদালত মত দিয়েছেন যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।

উল্লেখ্য যে, এইচআরপিবির পক্ষে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সারোয়ার আহাদ চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট মাহবুবুল ইসলাম এই রিটটি দায়ের করেছিলেন। এই মামলায় স্বাস্থ্য সচিব, আইজিপি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং বিএমডিসি প্রেসিডেন্টসহ মোট ১২ জনকে বিবাদী করা হয়েছিল।