ইতিহাস আড়াল ও বিকৃতি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই—এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ। তাঁর মতে, কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক যদি গভীরভাবে লক্ষ্য করেন, তবে স্পষ্টভাবে দেখতে পাবেন যে এই দুই প্রধান রাজনৈতিক দল ইতিহাস বিকৃতি ও সত্য আড়াল করার ক্ষেত্রে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি বিস্তারিত পোস্টের মাধ্যমে এই কড়া সমালোচনা ব্যক্ত করেন তিনি।

সোহেল তাজ তাঁর ফেসবুক পোস্টে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কি আসলে একই মুদ্রার এপিঠ ও ওপিঠ? তিনি যুক্তি দেখান যে, ইতিহাসের সত্যকে চাপা দেওয়া এবং নিজেদের সুবিধামতো ইতিহাস পুনর্লিখন করার বিষয়ে এই দুই দলের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই; বরং তারা একে অপরের চেয়ে বেশি ইতিহাস বিকৃত করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনকাল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সোহেল তাজ বলেন, সেই সময়ে একটি বিশেষ ব্যক্তিকে মহিমান্বিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অত্যন্ত পরিকল্পিত অপ-তৎপরতা এবং তথাকথিত 'গোয়েবেলসিয়ান' (Goebbelsian) প্রচার কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, এর মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের প্রকৃত ও সামগ্রিক ইতিহাসকে বিকৃত করে একটি নির্দিষ্ট বয়ান চাপিয়ে দেওয়া। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের পথচলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশাপাশি আরও অনেক মহান ব্যক্তিত্বের অসামান্য ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, শেখ হাসিনার আমলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এ কে ফজলুল হক এবং মাওলানা ভাসানীর মতো কিংবদন্তি নেতাদের অবদানকে পরিকল্পিতভাবে ছোট করা হয়েছে অথবা সম্পূর্ণ আড়াল করা হয়েছে।

সোহেল তাজ আরও উল্লেখ করেন, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতা—তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ অন্যদের অবদানকেও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এমনকি মুজিবনগর সরকারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরার পরিবর্তে সেটিকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বই নয়, জেনারেল ওসমানীর মতো বীর সেনানীদের অবদানকেও যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সৈনিক জিয়াউর রহমান, যিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে পুনরায় তা ঘোষণা করেন, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে 'রাজাকার' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল বলেও তিনি তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন।

আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বর্তমান বিএনপি এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতিও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সোহেল তাজ। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের প্রতি দেশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা থাকলেও ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, শেখ হাসিনার আমলের মতোই এখন পাঠ্যপুস্তকেও ইতিহাসের একটি ভিন্ন ও বিকৃত ধারা শুরু হয়েছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং নতুন প্রজন্মের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

এই বিষয়ে বিএনপি প্রধান তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সোহেল তাজ বলেন, একটি দেশের ইতিহাস হলো সেই দেশের আয়না। নতুন প্রজন্ম ইতিহাস থেকে অনেক ইতিবাচক শিক্ষা নিতে পারে এবং অনুপ্রাণিত হয়ে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে পারে। তাই একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব হলো সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে ইতিহাসের প্রবাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।

উল্লেখ্য, তাঁর এই গুরুতর অভিযোগগুলোর স্বপক্ষে সোহেল তাজ তাঁর ফেসবুক পোস্টে বিভিন্ন ছবি এবং একটি গণমাধ্যমের সংবাদের স্ক্রিনশট শেয়ার করেছেন, যা তাঁর বক্তব্যের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।