জীবনসংগ্রাম, ঋণের পাহাড় এবং পরিবারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক করুণ লড়াইয়ের গল্প সামনে এনেছেন জনপ্রিয় বলিউড ও ভারতীয় টেলিভিশনের প্রবীণ অভিনেত্রী সুস্মিতা মুখার্জি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা একটি ভিডিওতে ‘গোলমাল’ খ্যাত এই অভিনেত্রী তার ক্যারিয়ারের এক অন্ধকার ও বেদনাদায়ক অধ্যায়ের কথা খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি জানান, চরম আর্থিক সংকট এবং ১ কোটি রুপির মতো এক বিশাল ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে তিনি অতীতে এমন কিছু ‘সি-গ্রেড’ ও নারীবিদ্বেষী চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে বাধ্য হয়েছিলেন, যা নিয়ে তিনি আজ মোটেও গর্বিত নন। তবে নিজের সৃজনশীলতার বাইরে গিয়ে করা এসব কাজের জন্য মনে গভীর অনুশোচনা থাকলেও, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার তাগিদে নেওয়া ওই সিদ্ধান্তের বিষয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

সামাজিক মাধ্যমে এক অনুরাগীর করা প্রশ্নের জবাবে সুস্মিতার এই বিস্ফোরক কথাগুলো সামনে আসে। ওই অনুরাগী জানতে চেয়েছিলেন, কেন তিনি নারীদের প্রতি অবমাননাকর বা নিম্নমানের চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অভিনেত্রী জানান, প্রশ্নটি শুনে তিনি মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং তাকে জীবনের অত্যন্ত বেদনাদায়ক এক সময়ে ফিরে যেতে হয়েছিল। তিনি অত্যন্ত সততার সঙ্গে স্বীকার করেন যে, জীবনধারণের তাগিদে এবং পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে তিনি যেন নিজের আত্মাকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই সময়ে তিনি এই কাজগুলো করে মোটেও স্বস্তি পাননি এবং আজও পান না, কিন্তু তৎকালীন পরিস্থিতিতে তার কাছে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না।

অতীতের সেই ভয়াবহ প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে সুস্মিতা জানান, ২০০২ সালে চলচ্চিত্র জগতের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মুখে পড়ে তার ও তার স্বামীর প্রযোজনা সংস্থা ‘প্রয়াস প্রোডাকশন’ মারাত্মক ধসের মুখে পড়ে। এর ফলে তাদের কাঁধে চেপে বসে ১ কোটি রুপির এক বিশাল ঋণের বোঝা। সেই সময়ে কেবল তাদেরই নয়, ‘ট্র্যাক সিনেমা’ এবং ‘অনিল চৌধুরী প্রোডাকশন’-এর মতো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোও সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে যায়। ঋণের দায়ে তারা এমন এক সংকটে পড়েছিলেন যে, ঋণদাতারা সরাসরি তাদের বাসার দরজায় এসে পাওনা টাকার জন্য অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করত। রিকভারি এজেন্টদের ক্রমাগত উপদ্রব ও মানসিক চাপের কারণে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল।

ছোট ছোট সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে এবং ওই ১ কোটি রুপির ঋণ শোধ করার প্রবল তাড়নায় তিনি পুনরায় অভিনয়ে ফিরে আসেন এবং যেকোনো ধরণের কাজের প্রস্তাব গ্রহণ করতে বাধ্য হন। টানা ৩ থেকে ৪ বছর অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম এবং ত্যাগের বিনিময়ে তারা সেই পুরো ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হন। তবে দেনা পরিশোধের পাশাপাশি নিজ কন্যাসন্তানের উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানোও ছিল তার জীবনের অন্যতম বড় লক্ষ্য। পারিবারিক কিছু দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও তিনি তার মেয়েকে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে পাঠান। সন্তানের এই উচ্চশিক্ষার বিশাল খরচ চালানো এবং তাদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যেই তাকে প্রতিনিয়ত অর্থের পেছনে ছুটতে হয়েছিল এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনেক কাজ করতে হয়েছিল।

নিজের ক্যারিয়ার ও জীবনের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সুস্মিতা মুখার্জি জানান, একজন পেশাদার অভিনয়শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও সব সময় পছন্দমতো কাজ বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। অনেক সময় সংসারের চাকা সচল রাখতে এবং প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটাতে বাধ্য হয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনেক আপস করতে হয়। তবে বর্তমানে তিনি সেই কঠিন দিনগুলো কাটিয়ে এসেছেন। তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, এখন তিনি এমন কোনো কাজ গ্রহণ করেন না যা তার আত্মাকে নাড়া দেয় না বা যেখানে সম্মান পাওয়া যায় না। জীবনের এই পর্যায়ে এসে তিনি কেবল নিজের পছন্দমতো এবং সম্মানজনক প্রজেক্টেই কাজ করছেন বলে নিশ্চিত করেন এই প্রবীণ অভিনেত্রী। সূত্র: এনডিটিভি