**কূটনৈতিক শূন্যতায় চরম অনিশ্চয়তায় ৫৬ হাজার প্রবাসী: ২৭ দেশে নেই বাংলাদেশি মিশন**
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা, অধিকার এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা অপরিসীম। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্বের ২৭টি দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত থাকলেও সেখানে বাংলাদেশের কোনো নিজস্ব কূটনৈতিক মিশন বা কনস্যুলার সেবা নেই। ফলে কর্মক্ষেত্রে আকস্মিক বিপদ, জটিল আইনি লড়াই, দুর্ঘটনা, নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ, বকেয়া বেতন-ভাতা না পাওয়া কিংবা মানবপাচার ও প্রতারণার শিকার হলে এই প্রবাসীরা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পান না। এমন পরিস্থিতিতে তাঁরা সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েন এবং বাধ্য হয়ে তৃতীয় কোনো দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
সরকারি ও বিভিন্ন তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ২৭টি দেশে বর্তমানে অন্তত ৫৬ হাজার ৪৩০ জন বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত রয়েছেন। বিশ্বে ১৯৩টির বেশি স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের দূতাবাস, হাইকমিশন বা কনস্যুলার সেবা রয়েছে মাত্র ৮২টি দেশে। এই বিশাল ব্যবধানের কারণে বহু প্রবাসী বিদেশে গিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে মিশন স্থাপন করার জোরালো দাবি তুলেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি কম্বোডিয়াসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারিত হওয়ার ঘটনাগুলো এই সংকটের ভয়াবহতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে কম্বোডিয়ায় অনেক বাংলাদেশি কর্মী চাকরির প্রলোভনে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা ও তথাকথিত ‘স্ক্যাম সেন্টারের’ ফাঁদে পড়েছেন। সেখানে তাঁদের সাথে অমানবিক আচরণ এবং নির্যাতনের কথা জানা গেছে। একই ধরনের ঝুঁকি দেখা গেছে মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশেও। কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা একাধিক প্রবাসী আক্ষেপ করে জানান, দালালের প্রলোভন ও প্রতারণার কারণে তাঁরা এসব দেশে গিয়ে বিপদে পড়েন। সেখানে বিপদের মুহূর্তে কথা বলার মতো কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি বা সহযোগিতা পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। চরম দুর্ভোগের মাঝেও সবকিছুর জন্য তাঁদের পুনরায় সেই দালালদের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে, যারা তাঁদের বিপদে ঠেলে দিয়েছিল।
শুধু এশিয়া নয়, ইউরোপেও একই চিত্র। থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসীদের কনস্যুলেট সেবা দিলেও সেখানে কর্মরত কর্মকর্তাদের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে অনেক কর্মী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেতে ব্যর্থ হন। গ্রিসে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সানজিদা তার অভিজ্ঞতায় বলেন, ‘এ দেশে আসার পর থেকে দেখছি অনেক বৈধ ও অবৈধ বাংলাদেশি রয়েছেন। কিন্তু নিজস্ব দূতাবাস না থাকায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে আমাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে যারা অবৈধভাবে অবস্থান করছেন, তাঁরা কোনো সহায়তা চাইলেও তা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।’
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব দেশে বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক মিশন নেই, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন কম্বোডিয়ায়। সেখানে বর্তমানে ১৫ হাজার ৯২৩ জন কর্মী অবস্থান করছেন। এরপরের তালিকায় রয়েছে কিরগিজস্তান (৬ হাজার ৬৬৩ জন), সার্বিয়া (৫ হাজার ৯৯১ জন), লাওস (৫ হাজার ৭৭৮ জন) এবং কঙ্গো (৫ হাজার ১২০ জন)। এছাড়া ফিজিতে ৩ হাজার ৩৪৯ জন, বেলারুশে ২ হাজার ২৬৮ জন, উত্তর মেসিডোনিয়ায় ১ হাজার ৮০২ জন, ব্রাজিলে ১ হাজার ৫৬১ জন এবং মঙ্গোলিয়ায় ১ হাজার ৪২৯ জন কর্মী কর্মরত রয়েছেন।
ইউরোপের বেশ কিছু দেশেও কূটনৈতিক সেবার অভাব প্রকট। গ্রিস, মাল্টা, মলদোভা, ক্রোয়েশিয়া, বুলগেরিয়া, স্লোভেনিয়া, হাঙ্গেরি, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড এবং লিথুয়ানিয়ায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী থাকলেও সেখানে কোনো মিশন নেই। এছাড়া আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশ মোজাম্বিক, সোমালিয়া, আইভরি কোস্ট, আজারবাইজান, পাপুয়া নিউগিনি ও সামোয়ায় বেশ কিছু বাংলাদেশি কর্মী অবস্থান করছেন। সব মিলিয়ে এই ২৭টি দেশে কর্মরত বাংলাদেশির মোট সংখ্যা ৫৬ হাজার ৪৩০ জন।
ঢাকা ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ম্যানেজার আল আমিন নয়ন এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেট নেই এমন ২৭টি দেশে ৫৬ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছেন। তাঁরা সেখানে নিরাপদে আছেন কি না, কিংবা কোনো অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন কি না—তা তদারকি করার মতো কেউ নেই। কম্বোডিয়ার ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, কূটনৈতিক মিশন না থাকলে কর্মীরা খুব সহজেই স্ক্যাম সেন্টারে আটকা পড়তে পারেন। এই ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন থেকে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কঠোর মনিটরিং ও নজরদারি প্রয়োজন। কর্মী পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট দেশের বর্তমান পরিস্থিতি যাচাই করা এবং রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করা জরুরি।’
প্রবাসীদের জন্য একটি দূতাবাস বা কনস্যুলেট মানে কেবল পাসপোর্ট বা ভিসার কাজ করানো নয়; বরং এটি বিপদে পড়া প্রবাসীদের জন্য একটি জীবনরক্ষাকারী ঢাল। কোনো কর্মী নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধে জড়ালে, বেতন না পেলে, প্রতারিত হলে, গ্রেপ্তার হলে কিংবা দুর্ঘটনায় পড়লে দূতাবাসের আইনি সহায়তা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এমনকি কোনো প্রবাসীর মৃত্যু হলে মরদেহ দেশে পাঠানো, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শ্রমিকের মৌলিক অধিকার রক্ষায় কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু মিশন না থাকায় এই ৫৬ হাজার কর্মী আইনি লড়াইয়ে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন এবং তৃতীয় দেশের মিশনে ভরসা করতে হয়, যা প্রায়শই কার্যকর হয় না।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে দ্রুত মিশন স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, ‘যেসব দেশে প্রবাসীদের অভিযোগ বা প্রতারণার আশঙ্কা বেশি, সেগুলোকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখতে হবে। কম্বোডিয়াসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে প্রথম পর্যায়ে রেখে সেখানে প্রতিনিধি বা কনস্যুলেট স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে সব দেশে পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস খোলা সম্ভব না হলেও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। যেমন—কনস্যুলেট স্থাপন, লেবার উইং খোলা কিংবা বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ। এক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বিকল্প সমাধান হিসেবে আসিফ মুনীর ‘অনারারি কনসাল’ বা সম্মানসূচক কনস্যুল নিয়োগের কথা বলেন। তিনি জানান, অনেক দেশে প্রভাবশালী ও গ্রহণযোগ্য বাংলাদেশিদের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু করা যায়, যারা নিয়মিত রিপোর্ট করবেন এবং বিপদে পড়া প্রবাসীদের প্রাথমিক সহযোগিতা করবেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইমিগ্রেশন বা বিএমইটি থেকে যাদের ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়, তাঁরা যদি না জানেন ওই দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি কী, তবে শুধু যাওয়ার সুযোগ আছে বলেই কর্মী পাঠানো ঠিক হবে না। প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে কর্মী পাঠানো বন্ধ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
এদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার ও ওয়েলফেয়ার অনুবিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে ৮২টি দেশে তাদের সেবা চালু রয়েছে। সব দেশ সমান গুরুত্বপূর্ণ না হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশে সেবার অভাব রয়েছে, যা পার্শ্ববর্তী দেশের মিশনের মাধ্যমে পূরণ করার চেষ্টা করা হয়। তবে নতুন মিশন স্থাপনের ক্ষেত্রে আর্থিক সীমাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার এই বিষয়ে পর্যালোচনা করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পরিশেষে, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। কূটনৈতিক শূন্যতা দূর করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে আরও হাজার হাজার বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গিয়ে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, যা জাতীয়ভাবে অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং বেদনাদায়ক হবে।











