একটি নির্দিষ্ট তারিখ, একটি নির্দিষ্ট সময়, একটি রহস্যময় গোপন প্রকল্প আর কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুর আতঙ্ক—সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছিল এক অবিশ্বাস্য ও লোমহর্ষক দাবি। ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দাবি করা হচ্ছিল, আগামী ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট ঠিক ১৪টা ৩৩ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী) পৃথিবী মাত্র সাত সেকেন্ডের জন্য তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি হারাবে। দাবিটি আরও ভয়ঙ্কর করে তোলা হয়েছিল এই বলে যে, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি হারিয়ে যাওয়ার ফলে পৃথিবীতে এক অভূতপূর্ব ধ্বংসযজ্ঞ নেমে আসবে এবং এর ফলে প্রায় চার কোটি মানুষ প্রাণ হারাবেন। তবে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান এবং তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই পুরো দাবিটি ছিল একটি ভিত্তিহীন গুজব। নাসার বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি হারানোর কোনো সম্ভাবনা নেই এবং এমন কোনো ঘটনা ঘটা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব।

এই গুজবটির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তথাকথিত একটি ‘গোপন’ নথি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যে দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের নভেম্বরে নাসার একটি অত্যন্ত গোপনীয় নথি ফাঁস হয়েছে। সেই নথিতে ‘প্রজেক্ট অ্যাঙ্কর’ নামে একটি বিশেষ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দাবি করা হয়, নাসা এই প্রকল্পের মাধ্যমে পৃথিবীকে এক আসন্ন মহাজাগতিক বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুত করছে, যেখানে প্রায় চার কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে এবং আরও লাখ লাখ মানুষ গুরুতর আহত হতে পারেন। গুজবের প্রশারকরা নির্দিষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট ঠিক ১৪টা ৩৩ মিনিটে গ্রিনিচ মান সময় বা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় অনুযায়ী সকাল ৯টা ৩৩ মিনিটে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ সাত সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যাবে। একজন ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘যদি এটি ভুয়া হয়, তবে এর তারিখ, প্রকল্পের নাম এবং নির্দিষ্ট বাজেটের উল্লেখ কেন আছে?’ এই ধরনের কৌশলগত প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে কৌতূহল ও আতঙ্ক তৈরি করে এবং গুজবটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল। কিন্তু গভীর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কথিত সেই ফাঁস হওয়া নথির কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই এবং নাসার কোনো দপ্তরে ‘প্রজেক্ট অ্যাঙ্কর’ নামে কোনো প্রকল্পের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

গুজবটির প্রাথমিক সূত্র হিসেবে সামনে আসে ইনস্টাগ্রামের ‘@mr_danya_of’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট। ওই অ্যাকাউন্টের একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট পৃথিবী সাত সেকেন্ডের জন্য মাধ্যাকর্ষণ হারাবে এবং নাসা বিষয়টি আগে থেকেই জানে। পোস্টে আরও বলা হয়, নাসা এই বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষকে তা জানানো হচ্ছে না। এমনকি ওই পোস্টে দাবি করা হয়, ‘প্রজেক্ট অ্যাঙ্কর’-এর জন্য নাসা ৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার বরাদ্দ করেছে। সম্ভাব্য পরিণতির কথা বলে দাবি করা হয়, মাধ্যাকর্ষণ না থাকার কারণে মানুষ ও বস্তু আকাশে ভেসে উঠবে, যার ফলে অবকাঠামো ধসে পড়বে, ১০ বছরের দীর্ঘ অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসবে এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটবে। গুজবটিকে আরও রোমাঞ্চকর করতে কেউ কেউ দাবি করেন, ঠিক ওই সময়েই আর্কটিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে সূর্যের পূর্ণগ্রাস গ্রহণ দেখা যাবে। তবে এই পুরো গল্পের পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের দাবি ছিল, দুটি কৃষ্ণগহ্বরের (Black Hole) সংঘর্ষে তৈরি ‘মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গের’ ছেদবিন্দুর কারণে এই অদ্ভুত ঘটনা ঘটবে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ব্যাখ্যাটিই প্রমাণ করে যে মাধ্যাকর্ষণ কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের মৌলিক জ্ঞান নেই। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ‘স্নোপস’ এই বিষয়ে নাসার সাথে যোগাযোগ করলে নাসার এক মুখপাত্র সরাসরি জানান, ‘২০২৬ সালের ১২ আগস্ট পৃথিবী মাধ্যাকর্ষণ হারাবে না।’ নাসার ওই বিশেষজ্ঞ আরও ব্যাখ্যা করেন যে, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বা মোট মহাকর্ষীয় বল মূলত পৃথিবীর ভরের ওপর নির্ভর করে। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ হারাতে হলে পৃথিবীর কেন্দ্র, ম্যান্টল, ভূত্বক, মহাসাগর, স্থলভাগের পানি এবং বায়ুমণ্ডল—সব মিলিয়ে পৃথিবীর সামগ্রিক ভর হঠাৎ করে কমে যেতে হবে, যা মহাবিশ্বের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী অসম্ভব। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে হঠাৎ করে সাত সেকেন্ডের জন্য মাধ্যাকর্ষণ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার অস্তিত্ব নেই।

এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন হার্টফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষ্ণগহ্বর বিশেষজ্ঞ ড. উইলিয়াম অলস্টন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ থেকে তৈরি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এতটাই দুর্বল যে সেগুলো শনাক্ত করতে বিজ্ঞানীদের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জটিল যন্ত্র তৈরি করতে হয়েছে। পৃথিবীতে এর প্রভাব সরাসরি অনুভূত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি জানান, এই ধরনের তরঙ্গ নিয়মিত পৃথিবী ও মানুষের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং এগুলো আমাদের শরীরকে অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে সংকুচিত ও প্রসারিত করে। তবে সেই পরিবর্তন এতটাই ক্ষুদ্র—পরমাণুর আকারের চেয়েও বহু গুণ কম—যে তা মানুষের পক্ষে অনুভব করা অসম্ভব।

সবশেষে দেখা গেছে, যে ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে এই গুজবটির প্রচার শুরু হয়েছিল, সেটি আগে থেকেই মনগড়া ও ভিত্তিহীন প্রতিবেদন তৈরির জন্য কুখ্যাত। তাই ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট ঘড়ির কাঁটা ১৪টা ৩৩ মিনিটে পৌঁছালে মানুষ আকাশে ভেসে উঠবে বা কোটি কোটি মানুষ মারা যাবে—এমন আশঙ্কার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। নাসার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ১২ আগস্টও পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ঠিক আগের মতোই কার্যকর থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘প্রজেক্ট অ্যাঙ্কর’-এর গল্পটি আসলে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং ডিজিটাল যুগের অপপ্রচারের একটি উদাহরণ মাত্র।