সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে ওইদিন ঠিক কী ঘটেছিল, তা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নিজেকে দাবি করা শ্যামনগরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মঞ্জুর সরদার। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পাওয়ার পর জানালা দিয়ে তাকিয়ে মরিয়ম খাতুনকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। কক্ষের ভেতরে একটি চেয়ার ও প্লাস্টিকের টুল পড়ে ছিল বলে তিনি জানান। তবে ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ওই দিনের লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ দেন মোহাম্মদ মঞ্জুর সরদার। তিনি জানান, গত ২০ সেপ্টেম্বর আদালতের কিছু কার্যক্রমের জন্য সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম তাকে ফোন করে ডেকে নেন। আদালতের যাবতীয় কাজ শেষ করে বেলা ৩টার দিকে তারা ন্যাম ভবনের নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে ফিরে যান। মঞ্জুর সরদারের সাথে আরও পাঁচ-ছয়জন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। ফ্ল্যাটে পৌঁছে তারা গেস্ট রুমে বসে খাওয়া-দাওয়া করেন। অন্যদিকে, গাজী নজরুল ইসলাম তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা একটি কক্ষে আহার করেন বলে জানান তিনি।

মঞ্জুর সরদারের বর্ণনা অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর হঠাৎ গাজী নজরুল ইসলাম দ্রুত তাদের কাছে এসে ভেতরে যাওয়ার অনুরোধ জানান। সেখানে গিয়ে তারা লক্ষ্য করেন, একটি কক্ষের দরজা ভেতর থেকে দৃঢ়ভাবে বন্ধ। তারা বারবার দরজা খোলার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। এরপর তারা কক্ষটির পেছনের দিকে গিয়ে একটি খোলা জানালা দেখতে পান। জানালার পর্দা সরিয়ে ভেতরে তাকাতেই তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, কারণ সেখানে মরিয়ম খাতুনকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। মঞ্জুর দাবি করেন, মরিয়মের গলায় এবং সিলিং ফ্যানের সাথে কাপড়জাতীয় কিছু প্যাঁচানো ছিল। সেই কক্ষের ভেতরেই একটি চেয়ার এবং একটি প্লাস্টিকের টুল উল্টে পড়ে থাকতে দেখেন তারা।

মঞ্জুর আরও জানান, মরিয়ম জীবিত নাকি মৃত—তা নিশ্চিত হওয়ার পর তারা তাড়াহুড়ো করে দরজা-জানালা না ভেঙে পুলিশ এবং মরিয়মের পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দ্রুত সংসদ ভবন এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়। তাদের মাধ্যমে শেরেবাংলা নগর থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয় এবং উপস্থিত সবাইকে সরিয়ে নিতে বলে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীর এই বর্ণনা সত্ত্বেও মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো অস্পষ্ট। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনে কারও কোনো ভূমিকা বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা বিস্তারিত তদন্তের পরই পরিষ্কার হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, এই মর্মান্তিক ঘটনায় মরিয়ম খাতুনের বাবা মাসুম বিল্লাহ তার মেয়ের মৃত্যুর জন্য সরাসরি ওবায়দুল্লাহকে দায়ী করেছেন। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘ও আমার মেয়েকে ঘর থেকে বাইরে বের করেছে, ও-ই সবকিছু করেছে।’ মাসুম বিল্লাহ জানান, বিয়ের পর থেকে মরিয়ম ওই ফ্ল্যাটেই বসবাস করতেন। তবে বিয়ের পর মেয়ের সাথে কোনো ধরনের সমস্যা বা অভিযোগের কথা হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি জানান, মরিয়ম তার কাছে তেমন কোনো অভিযোগ করেননি। পুলিশ তাকে মরিয়মের লেখা বলে দাবি করা কয়েকটি চিঠি দেখিয়েছে বলে জানান মাসুম বিল্লাহ। তবে লেখাগুলো তার মেয়ের হাতের লেখা কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত হতে পারেননি।

জানা গেছে, গত রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে। পরবর্তীতে মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং শ্যালক ওবায়দুল্লাহকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যে গাজী নজরুল ইসলাম এবং তার প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে।

এদিকে, মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোমবার শ্যামনগরে তীব্র বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে স্থানীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ বাসিন্দারা জড়ো হন। এরপর ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে সেখান থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি উপজেলার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সমাবেশে স্থানীয় নাগরিক নেতা আসাদুজ্জামান মিটু, আবুল কালাম মড়ল, রেজাউল ইসলাম, আসিসুর রহমান, নূরনগরের আবুল ইউসুফসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সাথে গাজী নজরুল ইসলামের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনে উপনির্বাচনের দাবি তোলেন তারা। বিক্ষোভ কর্মসূচির সমাপ্তিতে উপজেলা প্রেস ক্লাবের সামনে গাজী নজরুল ইসলামের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়।