বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে উপকূলীয় অঞ্চল। তীব্র বাতাসের তোড়ে নোয়াখালীর হাতিয়ায় পৃথক পৃথক স্থানে তিনটি মাছ ধরার ট্রলার এবং লবণবাহী একটি বাল্কহেড ডুবে গেছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ছাবের আহমেদ (৬৫) নামে এক লস্করের মৃত্যু হয়েছে। তবে স্থানীয় জেলেদের দ্রুত তৎপরতায় মোট ৫৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। গতকাল দুপুরে বঙ্গোপসাগর ও মেঘনা নদীর মোহনায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ছাবের আহমেদ চট্টগ্রামের শিকলভাঙা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্গো ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের অর্থ সম্পাদক আব্দুল কাদের জানান, চট্টগ্রাম থেকে ১১ হাজার মণ লবণ নিয়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল কার্গো বাল্কহেড ‘এমভি আদনান’। হাতিয়ার ঠেঙ্গারচরে পৌঁছানোর পর হঠাৎ এর ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। প্রবল বাতাস ও উত্তাল ঢেউয়ের তোড়ে কার্গোটি ডুবে গেলে আট কর্মী বিপদে পড়েন। পরে পাশের একটি ট্রলারের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক ছাবের আহমেদকে মৃত ঘোষণা করেন।

অন্যদিকে, সকালে নিঝুমদ্বীপের কাছে সাগরে নাসির মাঝি, জহির মাঝি ও জাহেদ মাঝির তিনটি ট্রলার ঝড়ের কবলে পড়ে। ট্রলার মালিক নিশান চৌধুরী জানান, সাগরের প্রচণ্ড ঢেউয়ের মুখে দুটি ট্রলার সম্পূর্ণ ডুবে যায়। তবে কাছাকাছি থাকা অন্যান্য ট্রলারগুলোর সহযোগিতায় তিনটি নৌকার মোট ৪৮ জন মাঝিমাল্লাকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

সাগরে দুর্যোগের এই ভয়াবহতার মাঝে বাগেরহাটের কচুয়ায় ফুটে উঠেছে আরেক করুণ মানবিক চিত্র। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক দশকে এই উপজেলার বগা, বিষখালী, বাধাল, বড় আন্ধরমানিক, চাড়াখালী ও মাদারতলা গ্রামের অন্তত ৩৫ জন জেলে নিখোঁজ অথবা নিহত হয়েছেন। বিশেষ করে ২০১৫ সালের নভেম্বরেই একসঙ্গে ১৯ জন নিখোঁজ হওয়ার হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছিল। তবে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, নিখোঁজদের মরদেহ উদ্ধার করা না যাওয়ায় তাদের পরিবারগুলো কোনো মৃত্যু সনদ পায়নি। ফলে সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি থেকেও বঞ্চিত হয়ে জীবন কাটাচ্ছেন এই অসহায় পরিবারগুলো।

গতকাল কচুয়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এসব পরিবারের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়, যার আয়োজন করেছিল জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির কচুয়া উপজেলা শাখা। সভায় স্বজনহারা নারীরা তাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট ও অভাবের কথা অশ্রুসিক্ত চোখে তুলে ধরেন। বগা গ্রামের ফিরোজা বেগম জানান, ২০১৫ সালে ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তিনি চরম অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। মৃত্যু সনদ না থাকায় কোনো সরকারি সাহায্য মেলেনি, তাই তিনি তার শিক্ষিত ছোট ছেলের জন্য একটি চাকরির অনুরোধ জানান। একইভাবে তাসলিমা বেগম ও শিরিন আক্তার জানান, সন্তান হারিয়ে এখন অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোমতে বেঁচে আছেন তারা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ইব্রাহীম আমানী এই পরিবারগুলোকে টেকসই সহায়তার আওতায় আনার তাগিদ দেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন মৎস্যজীবী সমিতি জেলা শাখার আহ্বায়ক মো. নজরুল ইসলাম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী হাসান বলেন, ‘নিখোঁজ জেলেদের পরিবারগুলোকে দেওয়া বর্তমান সহযোগিতা অত্যন্ত অপ্রতুল। তাদের এই সংকট দূর করতে এবং সহায়তা বৃদ্ধি করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ বিশেষ অতিথি উপজেলা বিএনপি সভাপতি সরদার জাহিদ অসহায় পরিবারগুলোকে সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে স্থায়ী পুনর্বাসনের আশ্বাস দেন। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম।