আস্থার নাম যখন আতঙ্কে পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। দেশের অন্যতম বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এখন এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভোক্তাদের অন্ধ বিশ্বাসকে পুঁজি করে দেশজুড়ে প্রতারণার এক বিশাল জাল বিছিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রাণের জনপ্রিয় দুটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান—টেস্টি ট্রিট এবং মিঠাইয়ের আউটলেটে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বিশেষ অভিযান চালানো হয়। সেখানে যা পাওয়া গেল, তা রীতিমতো স্তম্ভিত করার মতো। অভিযানে মিলছে মেয়াদোত্তীর্ণ কেক এবং অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার।
তদন্তে দেখা গেছে, খাবারের উৎপাদন তারিখ এবং আউটলেটে পৌঁছানোর তারিখের মধ্যে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য রয়েছে। কাগজে-কলমে উৎপাদন তারিখ এক লেখা হলেও, আউটলেটে পৌঁছানোর তারিখ ভিন্ন এবং মেয়াদের হিসাব শুরু করা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কৌশলে। এই অভিনব প্রতারণার মাধ্যমেই ক্রেতাদের হাতে বাসি ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার তুলে দেওয়া হচ্ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, কারখানায় পণ্য উৎপাদনের দিন থেকেই মেয়াদের গণনা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু টেস্টি ট্রিট কর্তৃপক্ষ সেই আইনি বাধ্যবাধকতাকে উপেক্ষা করে পণ্য আউটলেটে প্রদর্শনের দিন থেকে মেয়াদের কাউন্টডাউন শুরু করে। তিন দিনের মেয়াদী খাবারকে ‘মার্কেটিং ডেট’ এবং ‘রিসিভিং ডেট’-এর দোহাই দিয়ে ইচ্ছেমতো বাড়ানো হচ্ছিল। এমনকি কম্পিউটারের চালানে সফটওয়্যার ভিত্তিক তারিখের জটিল গোলকধাঁধা তৈরি করে ক্রেতাদের সাথে নিয়মিত প্রতারণা চালানো হচ্ছিল।
প্রতারণার এই চিত্র কেবল চকচকে আউটলেটগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে পাবনার চাটমোহরে প্রাণ ডেইরি হাব সেন্টারে যে দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, তা ছিল আরও ভয়ংকর। সেখানে প্রায় আড়াই হাজার লিটার দুধে ডিটারজেন্ট এবং প্রাণঘাতী রাসায়নিক মেশানো হচ্ছিল। প্রশাসনের অভিযানে হাতেনাতে ধরা পড়ার পর সেই ভেজাল দুধ ধ্বংস করা হয় এবং এই ঘটনায় প্রাণের তিন কর্মকর্তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গুণগত মানের গালভরা বুলি আর ল্যাব টেস্টের দম্ভ যেন প্রশাসনের এই অভিযানের সামনে ধুলোয় মিশে গেছে। নামসর্বস্ব গুণগত মানের দোহাই দিয়ে দেশজুড়ে ভেজাল পণ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে এই অসাধু চক্র।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “সচেতনতার অভাবে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের এই চরম অসাবধানতা ও অনিয়মের কারণে বাড়ছে স্বাস্থ্যহানি, এমনকি ঘটছে অকাল মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও।” তবে তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুরুতে কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে ব্যবসায়ীদের সচেতন করার এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ দিতে চায় অধিদপ্তর। তবে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, বোঝানোর পরও যদি নিয়ম মানা না হয়, তবে এই অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্র্যান্ডের চকচকে সাইনবোর্ড আর আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের আড়ালে আর কতকাল চলবে এমন রমরমা ভেজাল বাণিজ্য? মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কবে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেই উত্তরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন সাধারণ ভোক্তারা।





















