ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, বিধ্বংসী দাবানল এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার প্রভাবে চলতি বছর ফ্রান্সে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত ৭ হাজার ৩০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বুধবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। বার্তা সংস্থা এএফপি-র বরাত দিয়ে ফ্রান্স২৪ এই খবরটি প্রকাশ করেছে।

ফ্রান্সে চলতি বছরের জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৫২ দিন তীব্র তাপপ্রবাহ অব্যাহত ছিল। ১৯৪৭ সালে তাপমাত্রার যথাযথ রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে এটিই দেশটির ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে চলা তাপপ্রবাহের ঘটনা। এ বছর ফ্রান্সে পর্যায়ক্রমে তিন দফা তীব্র তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে, যা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। প্রথম দফায় জুনে ১৪ দিন, দ্বিতীয় দফায় জুলাইয়ে ১৬ দিন এবং জুলাইয়ের শেষ দিকে শুরু হওয়া তৃতীয় দফা তাপপ্রবাহটি এখন পর্যন্ত টানা ২২ দিন ধরে চলছে।

ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য সংস্থার বিস্তারিত হিসাবে দেখা গেছে, ১৭ জুন থেকে ৩০ জুনের মধ্যবর্তী সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় ৫ হাজার ৭৬৪ জন বেশি মারা গেছেন। এরপর ২ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আরও ১ হাজার ২৪৩ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া মে মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া তীব্র গরমের প্রভাবে আরও ৩০০ জনের মৃত্যু শনাক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরের অতিরিক্ত মৃত্যুর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩০৭ জনে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রায় ৭৫ শতাংশই ঘটেছে ৭৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিকদের মধ্যে। তবে ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সী সব স্তরের মানুষের মধ্যেই এই তাপপ্রবাহের মারাত্মক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানিয়েছে যে, এই সমস্ত মৃত্যু সরাসরি তাপপ্রবাহের কারণেই হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। কারণ এই হিসাবটি সব ধরনের মৃত্যুকে অন্তর্ভুক্ত করে করা হয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত ও বিস্তারিত তথ্য আগামী শরতে প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

তাপপ্রবাহের দিনের সংখ্যার দিক থেকেও ২০২৬ সাল ফ্রান্সে এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এর আগে ২০২২ সালে মোট ৩৩ দিন তাপপ্রবাহ ছিল এবং ২০০৩ সালের ভয়াবহ গরমে তা ছিল ২২ দিন। উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের সেই ভয়াবহ তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যা তীব্রতা ও স্থায়িত্বের দিক থেকে এখনো দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এদিকে, ২০২৬ সালের ২৪ ও ২৫ জুন ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডে গড় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। এটি দেশটির সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রার এক নতুন রেকর্ড, যা ২০০৩ সালের আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। ফ্রান্সের পাশাপাশি পুরো পশ্চিম ইউরোপ চলতি বছরের গ্রীষ্মের শুরুতে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে। বারবার আসা এই তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে খরা ও বিধ্বংসী দাবানলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিয়েছে, যা পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।