সুনামগঞ্জে পারিবারিক কলহের এক মর্মান্তিক পরিণতিতে দুই নিষ্পাপ শিশু সন্তানকে হত্যা করে হাওরের পানিতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের জন্মদাতা পিতা কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এই লোমহর্ষক ঘটনায় অভিযুক্ত বাবাকে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আটক করেছে স্থানীয় পুলিশ। নিহিত দুই শিশুর মরদেহ পৃথক পৃথক স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত শিশুদের পরিচয় পাওয়া গেছে—সাত বছর বয়সী মুহাদ্দিস এবং চার বছর বয়সী তুলনা। তারা সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের পেরুয়া মধুপুর গ্রামের বাসিন্দা কামরুল ইসলামের সন্তান।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত রোববার (৯ আগস্ট) কামরুল ইসলাম তার দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। অভিযোগ রয়েছে, এরপর তিনি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শিশুদের হত্যা করেন এবং সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিস্তৃত ‘দেখার হাওরের’ পানিতে তাদের মরদেহ ফেলে দিয়ে পালিয়ে যান। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় ধরে শিশু দুটির কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুত তাদের সন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়।
তত্পরতার সাথে তল্লাশি চালানোর পর গত মঙ্গলবার শান্তিগঞ্জ উপজেলার ‘দেখার হাওরের’ বড়কাপন এলাকা থেকে শিশু তুলনার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। তবে মুহাদ্দিসের খোঁজ তখনও পাওয়া যায়নি। পরদিন বুধবার দুপুরে একই হাওরের সদর উপজেলার গোবিন্দপুর সংলগ্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় শিশু মুহাদ্দিসের মরদেহ। দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধারের পর পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং ঘটনার পেছনে রহস্যজনক কিছুর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে শিশু দুটির বাবা কামরুল ইসলামকে আটক করে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, কামরুল ইসলামের মোট চার সন্তান রয়েছে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সন্তানদের মধ্যে সামান্য ঝগড়া হলে তাদের মা প্রায়ই সন্তানদের কঠোরভাবে মারধর করতেন। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে কামরুলের স্ত্রী ও শাশুড়ির সঙ্গে তার প্রায়ই তীব্র বাকবিতণ্ডা এবং পারিবারিক কলহ চলত। এই দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ এবং পারিবারিক অশান্তির জেরেই গত রোববার তিনি এমন চরম পদক্ষেপ নেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, পারিবারিক বিরোধের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে কামরুল তার দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন এবং পরবর্তীতে তাদের হত্যা করে ‘দেখার হাওরের’ পানিতে ফেলে দেন। আটকের পর পুলিশের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে কামরুল ইসলাম নিজের সন্তানদের হত্যার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তবে ঠিক কীভাবে এবং কোথায় শিশুদের হত্যা করা হয়েছে, হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ কী এবং এই নৃশংস ঘটনায় অন্য কারো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা আছে কি না—তা খতিয়ে দেখতে গভীর তদন্ত চালানো হচ্ছে।
এই বিষয়ে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, কামরুল ইসলাম তার সন্তানদের হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। উদ্ধার করা দুই শিশুর মরদেহ বর্তমানে সুনামগঞ্জ সদর থানায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। ওসি আরও জানান, এ ঘটনায় শান্তিগঞ্জ অথবা সদর থানায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং যথাযথ মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে দুই শিশুর এই অকাল মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। পারিবারিক কলহ কীভাবে একটি শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়ার মতো নৃশংসতায় রূপ নিতে পারে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আশ্বস্ত করেছে যে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সব বিষয় তদন্ত করে প্রকৃত সত্য বের করা হবে এবং অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
একটি পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা শেষ পর্যন্ত দুটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন কেড়ে নিল। এমন মর্মান্তিক ঘটনায় স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্তের পাশাপাশি দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অমানবিক কাজ করার সাহস না পায়।









