দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন উঠে এসেছে এক সাম্প্রতিক জাতীয় জনমত জরিপে। স্বাধীন জনমত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডপলার রিসার্চ বাংলাদেশ লিমিটেড’ পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী মোট নাগরিকের ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসালটিংয়ের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল গত বুধবার (১৯ আগস্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

জরিপের ফলাফলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জোরালো সমর্থনের চিত্র ফুটে উঠলেও, সামগ্রিক সরকারি কর্মকাণ্ড এবং দেশের সামগ্রিক গতিপথ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আশাবাদ থাকলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সামনে তারা বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে নাগরিকরা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

জরিপের বিস্তারিত পদ্ধতি ও পরিধি
এই জরিপের মাঠপর্যায়ের কাজ পরিচালিত হয়েছে চলতি আগস্ট মাসে। প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের একটি প্যানেলের ওপর সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং সার্ভে ২০২৬’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে মোট ১০ হাজার ৪১৩টি কল করা হয়েছিল। ডপলার রিসার্চের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারের গত ১৮০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে মানুষের মনোভাবকে ‘সতর্ক আশাবাদ’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। মানুষ প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের কাজে সন্তুষ্ট থাকলেও, দেশ কোন পথে এগোচ্ছে তা নিয়ে তাদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। একইসঙ্গে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নে অনেক উত্তরদাতা এখনও দ্বিধায় রয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা ও দলীয় সমর্থনের প্রভাব
জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রাপ্তবয়স্কদের ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন। বিপরীতে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন তিনি ভালো করছেন না এবং ১২ দশমিক ১ শতাংশ কোনো মতামত প্রদান করেননি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা এবং আয়ের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এই সন্তুষ্টির হার প্রায় সব শ্রেণিতেই ৬১ দশমিক ৭ থেকে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে। আটটি ভিন্ন বিভাগের প্রতিটিতেই এই হার ৬২ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, শুধুমাত্র নিজস্ব দলের সমর্থকরাই নন, বরং বিরোধী মতাদর্শের সমর্থকদের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণযোগ্যতা বেশ বেশি। জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ, জাতীয় নাগরিক পার্টির সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, সামগ্রিক সরকারের কাজের মূল্যায়ন করে ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ একে ‘ভালো’ বলেছেন এবং ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ বলেছেন ‘খারাপ’। প্রতিটি দলীয় সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যেই একটি সাধারণ প্রবণতা দেখা গেছে—প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা সরকারের সামগ্রিক মূল্যায়নের চেয়ে বেশি এবং সরকারের মূল্যায়ন দেশের গতিপথের মূল্যায়নের চেয়ে উচ্চতর।

দেশের গতিপথ ও রাজনৈতিক বিভাজন
দেশ সঠিক পথে চলছে বলে মনে করেন অংশগ্রহণকারীদের ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন দেশ ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ এই প্রশ্নে কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি, যা জাতীয় পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অনাগ্রহ। দলীয় ভিত্তিতে এই মতভেদের পার্থক্য অত্যন্ত প্রকট। বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন দেশ সঠিক পথে আছে, যেখানে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে এই হার সর্বনিম্ন ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

অর্থনৈতিক সংকট ও নাগরিক উদ্বেগ
দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা চিহ্নিত করতে গিয়ে কোনো নির্দিষ্ট তালিকা ছাড়াই ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ নাগরিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামকে প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখিয়েছেন। তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি (৩২ দশমিক ৬ শতাংশ) এবং কর্মসংস্থানের অভাব (৩০ দশমিক ৮ শতাংশ)।

যে দুটি বিষয়কে সবচেয়ে বড় সমস্যা বলা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকারিতা সবচেয়ে নিম্নপর্যায়ে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। জ্বালানি ও গ্যাসের ক্ষেত্রে এই অসন্তোষের হার ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা মনে করেন ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ।

ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা ও পারিবারিক অবস্থা
আর্থিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, এক বছর আগের তুলনায় তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন আরও খারাপ হয়েছে। তবে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন তাদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। আগামী ১২ মাসে পরিস্থিতি ভালো হবে বলে আশা করছেন ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ, আর ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেন অবস্থা আরও খারাপ হবে। তবে সামগ্রিকভাবে দেশ নিয়ে ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ এক বছর আগের চেয়ে বেশি আশাবাদী, যদিও ৩৯ শতাংশ কম আশাবাদী এবং ৬ দশমিক ২ শতাংশ মনে করেন কোনো পরিবর্তন আসেনি।

নীতিগত সমর্থন ও সামাজিক নিরাপত্তা
সরকারের বিভিন্ন বিশেষ উদ্যোগের প্রতি ব্যাপক সমর্থন দেখা গেছে। ফ্যামিলি কার্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ, নতুন করনীতিকে সমর্থন করেছেন ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ৭০ দশমিক ০ শতাংশ মনে করেন সরকারের উচিত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের কাজকে ভালো বলেছেন ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়কের কাজকে সমর্থন করেছেন ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ নাগরিক।

সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নারী ও সংখ্যালঘুরা কিছুটা পিছিয়ে আছেন। নিজের এলাকায় সন্ধ্যার পর একা হাঁটতে নিরাপদ বোধ করেন ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ নিরাপদ বোধ করলেও, মুসলিম উত্তরদাতাদের মধ্যে এই হার ৯৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং হিন্দু উত্তরদাতাদের মধ্যে তা ৮২ শতাংশ।