কামরুজ্জামান:
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জরিপ শাখার কর্মচারী ওমর ফারুকের সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর এবার সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রাজউকের জোন-১ পরিচালক রাজিয়া সুলতানার পিওন সুলতানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে ধারণ করা একটি ভিডিওতে সুলতানকে ওমর ফারুকের বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা ও ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। এমনকি ওই সময় ৫ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিকরা অর্থ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন রাজউকের জরিপ শাখায় কর্মরত ওমর ফারুকের নামে রাজধানীর উত্তরা তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার ১১ নম্বর রোডের ইউডিপি গলিতে একটি আটতলা ভবন রয়েছে। একই এলাকার ব্লক-ডি, ৫ নম্বর রোডের ৩ নম্বর বাসায় তাঁর মালিকানাধীন আরও একটি ছয়তলা ভবনের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়ভাবে ভবনটি ‘সরকার মঞ্জিল’ নামে পরিচিত।
এ ছাড়া তাঁর নিজ জেলা কুমিল্লাতেও বড় বাড়ি ও সম্পদের তথ্য সামনে এসেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—একজন রাজউক কর্মচারীর নামে থাকা এসব সম্পদের উৎস কী এবং তাঁর ঘোষিত আয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না।
উল্লেখ্য, সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী সংরক্ষণ ও হালনাগাদের ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি রাজউকের ওয়েবসাইটেও স্থাবর সম্পদের হিসাব বিবরণীসংক্রান্ত নোটিশ প্রকাশিত হয়েছে। তাই ওমর ফারুকের সম্পদের বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই। তাঁর নামে থাকা সম্পদগুলো সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে কি না, সম্পদের অর্থের উৎস কী দেখানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কখনো তা যাচাই করেছে কি না—তা এখন প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
কারণ একজন কর্মচারীর সম্পদের তথ্য নিয়ে অভিযোগ উঠলে শুধু ওই কর্মচারীর জবাবই যথেষ্ট নয়; প্রাতিষ্ঠানিক যাচাইয়ের নথিও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজউকের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তাদের আওতাধীন ভবনগুলোতে ইমারত পরিদর্শকদের নিয়মিত নজরদারির দায়িত্ব রয়েছে। কোনো ভবনে অনুমোদন বহির্ভূত নির্মাণ বা বিচ্যুতি পাওয়া গেলে নোটিশ দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও বিধান রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন—ওমর ফারুকের নামে থাকা ভবনগুলোর ক্ষেত্রে এই নিয়মিত তদারকি হয়েছে কি না?
ওমর ফারুকের নামে থাকা ভবনগুলোর ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি বিষয় নথি যাচাই করে স্পষ্ট হওয়া দরকার- ভবনগুলোর অনুমোদিত নকশা, নির্মাণ অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, ভবনের উচ্চতা, আয়তন, রাস্তার প্রস্থ, সেটব্যাক এবং অনুমোদিত তলার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের মিল রয়েছে কি না—এসব বিষয় পরীক্ষা করা অতীব জরুরী।
রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে এবং আট তলার বেশি ভবনকে বড় ও বিশেষ প্রকল্প হিসেবে বিবেচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সুতরাং প্রশ্ন হচ্ছে—ওমর ফারুকের নামে থাকা ভবনগুলো কোন ফাইল নম্বরে অনুমোদিত, কে নকশা অনুমোদন করেছেন এবং নির্মাণের পর বাস্তব অবস্থা রাজউকের অনুমোদিত নকশার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে কি না?
এদিকে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের অভিযোগ, ওমর ফারুকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সুলতান এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। একটি ভিডিওতে তাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায়। সেখানে সাংবাদিকদের পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
সাংবাদিকরা টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি তাদের।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে—রাজউকের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী কেন তার সহকর্মীর বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদ থামাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতার চেষ্টা করবেন? আর যদি এমন চেষ্টা সত্যিই হয়ে থাকে, তাহলে ওই অর্থের উৎস কী এবং কার নির্দেশে বা কার স্বার্থে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল—তা তদন্তের বিষয়।
পরবর্তীতে অন্য এক সাংবাদিক এ বিষয়ে ওমর ফারুকের বক্তব্য জানতে ফোন করলে তিনি কোনো প্রকার তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। ওই সাংবাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওমর ফারুক তাঁর অফিসের একজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করে কোনো লাভ হবে না বলেও মন্তব্য করেন।
এ ধরনের বক্তব্য প্রভাব বিস্তার বা প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ব্যবহারের অভিযোগকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করার প্রয়োজন তৈরি করে।
এদিকে, সুলতানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নন বলে সাফ জানিয়ে দেন এবং রাজউকের উত্তরা কার্যালয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেন বলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের দাবি।
পরে ওই সাংবাদিক জোন-১ পরিচালক রাজিয়া সুলতানার সঙ্গে কথা বলতে কার্যালয়ে গেলে তাঁকে পরিচালকের কক্ষে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসময় পিওন সুলতান জানান, পরিচালকের নির্দেশনা অনুযায়ী এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য থাকলে তা অনুমোদিত কর্মকর্তার মাধ্যমে জানাতে হবে।
পরবর্তীতে রাজিয়া সুলতানার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পুরো ঘটনায় এখন প্রশ্ন শুধু ওমর ফারুকের ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে নয়। প্রশ্ন উঠছে রাজউকের অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও জবাবদিহি ব্যবস্থা নিয়েও।
একজন কর্মচারীর নামে একাধিক বহুতল ভবন থাকলে তাঁর সম্পদ বিবরণী যাচাই হয়েছে কি না, ভবনগুলোর অনুমোদন কে দিয়েছেন, নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্ট শাখা কী ধরনের তদারকি করেছে, কোনো অনিয়ম ধরা পড়েছিল কি না এবং ধরা পড়লে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—এসব তথ্য রাজউকের নথি থেকেই বের করা সম্ভব।
এমতাবস্থায় রাজউকের কাছে স্পষ্ট কিছু প্রশ্ন—ওমর ফারুকের সম্পদের হিসাব কি নিয়ম অনুযায়ী যাচাই করা হয়েছে? তাঁর নামে থাকা ভবনগুলোর অনুমোদিত নকশা ও বাস্তব নির্মাণ কি মিলে? ভবনগুলো নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্ট রাজউক কর্মকর্তারা কী ধরনের তদারকি করেছেন? সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগের বিষয়ে কি তদন্ত হবে? কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে প্রভাব বা অর্থ ব্যবহারে সহযোগিতা করে থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা?
কারণ, রাজউকের মতো নগর উন্নয়ন ও ভবন অনুমোদনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি শুধু একজন কর্মচারীর দায় নির্ধারণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একটি ভবনের অনুমোদন যেমন নথিতে থাকে, তেমনি একটি অভিযোগের জবাবও নথি, তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে দায়মুক্ত করার স্বচ্ছ প্রক্রিয়া—দুই ক্ষেত্রেই রাজউকের দায়িত্ব একটাই: জনগণের সামনে তথ্য ও সিদ্ধান্ত পরিষ্কার করা।





















