বাংলাদেশ পুলিশে নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির চেষ্টা: রংপুরে দালাল চক্রের চার সদস্য গ্রেপ্তার

বাংলাদেশ পুলিশের ক্যাডেট এএসআই (নিরস্ত্র) ২০২৬ সালের নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির চেষ্টার অভিযোগে এক সক্রিয় দালাল চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে রংপুর জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। শনিবার দুপুরে রংপুর জেলা পুলিশের মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে। অভিযানের সময় পুলিশ জাল প্রবেশপত্র, অর্থ লেনদেনের ডিজিটাল স্ক্রিনশট এবং মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করেছে।

তদন্ত চলাকালীন গ্রেপ্তারকৃত আশরাফুল ইসলাম পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন যে, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কামালকাছনা কার্যালয়ে কর্মরত বাদশা মাসউদ আলম (৪৮) এবং নুরুল ইসলাম (৪৬)-এর মাধ্যমে তার বাবার সঙ্গে ১৭ লাখ টাকার বিনিময়ে পুলিশে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার একটি চুক্তি হয়েছিল। চুক্তির প্রথম কিস্তি হিসেবে তিনি দিনাজপুর শাখা থেকে ঢাকা ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট হিসাবে আড়াই লাখ টাকা জমা দেন। এরপর হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তার কাছে একটি জাল প্রবেশপত্র পাঠানো হয়। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিয়ম অনুযায়ী তিনি কোনো শারীরিক পরীক্ষায় অংশ নেননি। তা সত্ত্বেও ওই জাল প্রবেশপত্র ব্যবহার করে তিনি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের চেষ্টা করেন।

গ্রেপ্তারকৃতরা মূলত একটি সুসংগঠিত চক্রের অংশ হিসেবে কাজ করত। তারা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ক্যাডেট এএসআই (নিরস্ত্র)/২০২৬ পদে নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের প্রলুব্ধ করত এবং জাল প্রবেশপত্র প্রস্তুত করত। গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় পাওয়া গেছে— মোঃ আশরাফুল ইসলাম (২১), ফায়ার সার্ভিসের কামালকাছনা অফিসের ডেপুটি এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর মোঃ বাদশা মাসউদ আলম (৪৮), মোঃ তাজমিলুর রহমান (১৯) এবং মোঃ নুরুল ইসলাম (৪৬)।

পুলিশ জানিয়েছে, রংপুর জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের বিশেষ নির্দেশনায় এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (ক্রাইম অ্যান্ড অপস)-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে নিয়োগ পরীক্ষা চলাকালীন ডিবির একটি বিশেষ দল নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। রংপুর পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের মূল ফটকে স্থাপিত ফেস ডিটেকশন পয়েন্টে প্রবেশের সময় আশরাফুল ইসলাম নামের এক পরীক্ষার্থীর আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাকে যাচাই করা হয়। পরবর্তীতে তাকে একাডেমিক ভবনে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি স্বীকার করেন যে, তার কাছে থাকা প্রবেশপত্রটি সম্পূর্ণ জাল। একই সময়ে আশরাফুলের পরিবর্তে প্রক্সি পরীক্ষা দিতে আসা তাজমিলুর রহমানকেও পুলিশ আটক করে।

আশরাফুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় ডিবি পুলিশ। রংপুর নগরীর জাহাজ কোম্পানি মোড় এলাকা থেকে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অফিসে কর্মরত বাদশা মাসউদ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন তল্লাশি করে প্রতারণা, আর্থিক লেনদেন এবং জাল প্রবেশপত্র তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ডিজিটাল প্রমাণ উদ্ধার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে বাদশা মাসউদ আলম স্বীকার করেন যে, নুরুল ইসলামসহ আরও দুই থেকে তিনজন ব্যক্তি এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। তারা দীর্ঘদিন ধরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পুলিশের ক্যাডেট এএসআই পদে চাকরি দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল।

এই চক্রটি কেবল জাল প্রবেশপত্র তৈরিই করত না, বরং বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করত, যাতে তাদের কার্যক্রম গোপন থাকে। পরবর্তীতে আরপিএমপির কোতোয়ালি থানার সহযোগিতায় রাজধানী ঢাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের অন্যতম সদস্য নুরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনায় মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।

রংপুর জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক এই বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, “বাংলাদেশ পুলিশে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম, জালিয়াতি বা দালাল চক্রের কোনো স্থান নেই। যারা চাকরি দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন নিয়ে প্রতারণা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”