আগামী অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফরের ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরের তালিকায় রয়েছে জাপান ও সৌদি আরব, যেখানে তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে যাবেন। পাশাপাশি, তুরস্কের আনাতোলিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ৩১তম সম্মেলনে (কপ৩১) অংশ নিতে তিনি সেখানে সফর করবেন। টোকিও, রিয়াদ ও আঙ্কারায় নিয়োজিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো গত শনিবার প্রথম আলোকে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেছে। জানা গেছে, অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে জাপান এবং নভেম্বরের প্রথম দিকে তুরস্ক ও দ্বিতীয়ার্ধে সৌদি আরব সফরের প্রাথমিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে ইতিমধ্যেই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা ও যোগাযোগ শুরু হয়েছে।

জাপান সফরের বিস্তারিত ও কৌশলগত গুরুত্ব
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বিশেষ আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে টোকিও সফরে যাবেন। তিন থেকে চার দিনের এই সফরের বিষয়ে সম্প্রতি ঢাকায় দুই দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ ও কার্যকর করার প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস টোকিও সফর করেছিলেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই সফরে বিনিয়োগ, জ্বালানি ও উন্নত প্রযুক্তি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে মোট সাতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এছাড়া, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জাপানে এক লাখ দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই সফরে দুই দেশ তাদের কৌশলগত অংশীদারত্ব পুনর্নিশ্চিত করার পাশাপাশি ‘বে অব বেঙ্গল’ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জাপানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ সম্প্রসারণে বিশেষ সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন এই সফরে বিনিয়োগের সুযোগ আরও বাড়ানো, ব্যবসায়ী সম্মেলন আয়োজন এবং জনশক্তি রপ্তানির বর্তমান অগ্রগতির বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রাধান্য পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তুরস্ক সফর ও কপ৩১ সম্মেলনের গুরুত্ব
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সংহতি অর্জনে তুরস্কের আনাতোলিয়ায় আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে কপ৩১ সম্মেলন। এই সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ১১ ও ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া শীর্ষ নেতাদের বিশেষ বৈঠক। এই দুই দিনের হাই-লেভেল সম্মেলনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তুরস্ক সফর করবেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কপ৩১-এর প্রথম দুই দিনের পরিবর্তে তৃতীয় ও চতুর্থ দিনে শীর্ষ নেতাদের সম্মেলন রাখার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক মনোযোগ ধরে রাখার একটি সুনিপুণ কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির এক দশকের বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর এখন আর নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই লক্ষ্যগুলোর বাস্তবায়ন। জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিপূরণ তহবিল কতটা কার্যকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে পৌঁছাবে, তা হবে এই সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই মঞ্চে বাংলাদেশের হয়ে জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং অর্থায়নের দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

সৌদি আরব সফর: শ্রমবাজার থেকে বিনিয়োগের দিকে রূপান্তর
নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে সৌদি আরবের যুবরাজ ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে রিয়াদ সফরের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। এই পরিকল্পিত সফরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ককে কেবল ঐতিহ্যগত জনশক্তি রপ্তানির গণ্ডি থেকে বের করে এনে বহুমুখী অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকে নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গত আগস্টে সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ এল-খেরেজি ঢাকা সফরে এসে এক বৈঠকে মৎস্য, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের মতো আধুনিক ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগের প্রবল আগ্রহ ব্যক্ত করেছিলেন। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আব্দুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়া উল্লেখ করেছেন যে, আগামী পাঁচ বছর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য একটি রূপান্তরমূলক পর্যায় হতে পারে। তিনি বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গতিশীল এবং আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। বর্তমানে ২৮ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছেন, যা দেশটিকে বাংলাদেশের জন্য বৃহত্তম শ্রমবাজারে পরিণত করেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, জ্বালানি আমদানির নতুন চুক্তি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মতবিনিময় হতে পারে। পাশাপাশি, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা প্রশ্নে সৌদি আরবের অব্যাহত সমর্থন এবং সহযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি এই সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, এই তিন দেশ সফর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক পরিপক্কতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, জলবায়ু সুরক্ষা এবং কৌশলগত মিত্রতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বদ্ধপরিকর।