কুমিল্লার দেবিদ্বারে নিজ মা পিয়ারা বেগম ও ছয় মাস বয়সী ভাতিজি ইসরাত জাহানকে নির্মমভাবে কুপিয়ে ও আছাড় দিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন আটক যুবক ইমন মিয়া (২৯)। মঙ্গলবার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৪-এর বিচারক সায়মা শরীফ নিশাতের আদালতে তিনি এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, ১৬৪ ধারায় ইমনের জবানবন্দি গ্রহণ শেষে বিচারক তাকে কুমিল্লা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান এই তথ্যের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ঘটনাটি ঘটে গত সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার বড়শালঘর গ্রামের দক্ষিণপাড়ার মোস্তফা মাস্টারের বাড়িতে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে শিশুটির মা ও ইমনের ভাবি রাবেয়া বেগম গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অভিযুক্ত ইমন মিয়া ওই গ্রামের মৃত ফরিদ উদ্দিনের ছেলে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় পাঁচ বছর আগে ফুটবল খেলতে গিয়ে পায়ে গুরুতর আঘাত পান ইমন, যার ফলে তার লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। এরপর থেকে তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারতেন না। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন কবিরাজি ও আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করা সত্ত্বেও তিনি কোনো সুফল পাননি। বন্ধু ও স্বজনদের আর্থিক সহায়তায় তার পায়ে দুই দফা অস্ত্রোপচার করা হলেও অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি। সম্প্রতি চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর তার পায়ের যন্ত্রণা আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের পঙ্গুত্ব, বেকারত্ব, চরম দারিদ্র্য এবং পায়ের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তিনি জীবন শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। এর আগে বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি।

গত রবিবার রাতে পায়ের তীব্র যন্ত্রণায় দিশেহারা হয়ে ইমন আবারও আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তার মা পিয়ারা বেগম ও ভাবি রাবেয়া বেগম তাকে বাধা দেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যায় বাধা দেওয়ার এই ঘটনাটিই সোমবার সকালের নৃশংসতার সূত্রপাত করে। সোমবার সকালে ইমন মা ও ভাবির ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে গালিগালাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে ঘরে থাকা ধারালো দা দিয়ে তাকে হত্যা করতে অথবা পা কেটে দিতে মাকে অনুরোধ করেন তিনি। মা তাকে নিবৃত্ত করতে গেলে ইমন হঠাৎ হিংস্র হয়ে ওঠেন এবং তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করেন।

শাশুড়িকে বাঁচাতে রাবেয়া বেগম ছুটে এলে তার কোলে থাকা ছয় মাস বয়সী শিশু ইসরাতকে ছিনিয়ে নিয়ে ইমন দুইবার সজোরে আছাড় মারেন। এই ভয়াবহ আক্রমণে ঘটনাস্থলেই মা পিয়ারা বেগম ও শিশু ইসরাতের মৃত্যু হয়। এরপর ইমন লাঠি দিয়ে পিটিয়ে রাবেয়া বেগমকেও গুরুতর আহত করেন। চিৎকার শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে রাবেয়াকে উদ্ধার করে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে দ্রুত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন।

দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মহিবুস সালাম খান জানান, রাবেয়ার মাথায় বেশ কয়েকটি গভীর ক্ষত থাকায় সেলাই দিতে হয়েছে এবং তার শারীরিক অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা ইমনকে আটক করে পুলিশে খবর দেন, যার ফলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নেয়।

দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, এই মর্মা সোমবার সন্ধ্যায় ইমনের বড় ভাই সুজন মিয়া বাদী হয়ে তার ছোট ভাই ইমন মিয়াকে একমাত্র আসামি করে দেবিদ্বার থানায় মামলা দায়ের করেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে এবং ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদানের পর বিচারক অভিযুক্ত ইমন মিয়াকে কুমিল্লা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।