ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় খুচরা মুদ্রার তীব্র সংকটে চরম অসহায় অবস্থায় পড়েছেন ভিক্ষুকরা। দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য তারা যে সামান্য মুদ্রার ওপর নির্ভর করেন, তার অভাব এখন তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। আগে পথচারী, দোকানদার ও ক্রেতাদের কাছ থেকে ১, ২ কিংবা ৫ টাকা করে পেলেও বর্তমানে অনেকের পকেটেই খুচরা টাকা থাকে না। ফলে সারাদিন রাস্তায় ঘুরেও আগের মতো আয় করতে পারছেন না তারা। এই পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন বয়সের ভারে ন্যুব্জ এবং শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষগুলো, যাদের উপার্জনের অন্য কোনো পথ নেই।

জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, সড়ক ও জনবহুল এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুচরা টাকার অভাবের কারণে অনেক দাতা এখন নগদ অর্থের পরিবর্তে খাবার দিয়ে সহযোগিতা করছেন। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষুধার জ্বালা প্রশমিত হলেও সংসারের অন্যান্য জরুরি প্রয়োজন মেটানোর মতো অর্থ তাদের হাতে থাকছে না। রাণীশংকৈল পৌর শহরে আসা একাধিক ভিক্ষুক আক্ষেপ করে জানান, আগে সারাদিন বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে মোটামুটি সন্তোষজনক অর্থ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন অধিকাংশ মানুষই বলেন, ‘খুচরা টাকা নেই।’ কেউ কেউ সাহায্য করতে চাইলেও খুচরা মুদ্রার অভাবে তা দিতে পারছেন না। ফলে দীর্ঘ সময় রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় ঘুরেও তাদের আয় এখন খুবই সামান্য।

একজন বয়স্ক ভিক্ষুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আগে সারাদিন ঘুরলে কোনো রকমে সংসার চালানোর মতো টাকা হতো। এখন অনেকেই বলেন খুচরা পয়সা নেই। তাই আগের চেয়ে আয় অনেক কমে গেছে। বয়স হয়েছে, শরীর আর চলে না, কোনো কাজ-কামও করতে পারি না। এই সামান্য টাকা দিয়েই বাড়ির খরচ চালাতে হয়, এখন তা পাওয়া যাচ্ছে না।’

রাণীশংকৈল পৌর শহরের ব্যবসায়ী শামসুদ্দিন সাগর বলেন, ‘১, ২ কিংবা ৫ টাকার নোট বা কয়েন হাতে না থাকায় সবাইকে সহযোগিতা করা সম্ভব হয় না। ১০ টাকা করে দিলে সারাদিনে অনেক টাকা চলে যায়, যা নিজের ব্যবসার আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। তবে লক্ষ্য করছি, দিন দিন ভিক্ষুকের সংখ্যাও বাড়ছে। বিশেষ করে বুধবারের হাটের দিনে তাদের ভিড় অনেক বেশি দেখা যায়।’

মুদি ব্যবসায়ী ফেরদৌস একই কথা echoed করে বলেন, ‘ভিক্ষুকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি খুচরা টাকার সংকটে ইচ্ছা থাকলেও সবাইকে সাহায্য করা সম্ভব হয় না। তবে বয়স্ক ও অসহায় মানুষদের ভিক্ষার ওপর নির্ভরশীল না রেখে সরকারি উদ্যোগে তাদের পুনর্বাসন করা এখন সময়ের দাবি।’

স্থানীয় সচেতন বাসিন্দারা মনে করেন, ভিক্ষুকদের অনেকেই বার্ধক্য কিংবা শারীরিক অক্ষমতার কারণে শ্রমনির্ভর কাজ করতে পারেন না। তাদের জন্য শুধু একবেলার খাবার নয়, বরং প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ও মর্যাদাপূর্ণ সহায়তা। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রকৃত অসহায়দের যথাযথভাবে তালিকাভুক্ত করে নিয়মিত ভাতা, চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে তাদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে।

খুচরা টাকার সংকট হয়তো সাধারণ মানুষের কাছে খুব ছোট একটি সমস্যা মনে হতে পারে, কিন্তু সেই সামান্য কয়েন বা নোটের ওপর নির্ভর করেই রাণীশংকৈলের অনেক অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। তাই এই সমস্যাটিকে শুধু ‘ভিক্ষা’ হিসেবে না দেখে এর পেছনে থাকা চরম দারিদ্র্য, বার্ধক্য ও অসহায়ত্বকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুর রহিম জানান, ‘বর্তমানে এই উপজেলায় জরিপকৃত ভিক্ষুকের সংখ্যা ১ হাজার ২০০-এর অধিক। এদের মধ্যে প্রায় ৫০ জনকে সরকারিভাবে দোকান, গবাদিপশু ও গাড়ি কিনে দিয়ে পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়েছে। এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে এবং আরও বেশি মানুষকে স্বাবলম্বী করতে সরকারি বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন।’