ভারতে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে এখন উত্তাল ঝাড়খণ্ড। নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সেখানে আন্দোলন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। মূলত ১৪তম জেপিএসসি (JPSC) প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বাতিল, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং রাজ্যের সামগ্রিক নিয়োগ ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী। এই আন্দোলনের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিতে সোমবার (৩ আগস্ট) রাঁচির জয়পাল সিং মুণ্ডা স্টেডিয়ামে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছেন প্রথিতযশা ছাত্রনেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো। ইতিমধ্যে এই লড়াইয়ে সক্রিয় সমর্থন জানিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি), যার ফলে বিক্ষোভের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম এবং প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে রোববার থেকে অনশনে বসেন দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতার কারণে বারবার মেধাবী শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের স্বপ্ন এবং সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া এক আবেগপূর্ণ ও দৃঢ় বক্তব্যে দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, গত মাসে ১৪তম জেপিএসসি প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরপরই এই বিতর্কের সূত্রপাত এবং পরবর্তীতে আন্দোলনের জন্ম হয়।
বার্তা সংস্থা এএনআই-এর সাথে আলাপকালে তিনি বিস্তারিত জানান, ঠিক এক মাস আগে, অর্থাৎ গত মাসের ২ তারিখে যখন ১৪তম প্রিলিমিনারি টেস্টের ফলাফল ঘোষণা করা হয়, তখনই অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫ জুলাই থেকে শিক্ষার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দোলন শুরু করেন। ৭ জুলাই প্রতিনিধি দল রাজ্য সরকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং ৮ জুলাই ক্ষোভ প্রকাশের জন্য কুশপুত্তলিকা দাহ করে প্রতিবাদ জানানো হয়। এরপর ২০ জুলাই সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রমাণাদি জমা দেওয়া হয়। সেই সাক্ষাতের পর সরকারি স্তরে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি বলে দাবি করেন তিনি।
দেবেন্দ্রনাথের অভিযোগ, দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চললেও রাজ্য সরকার এবং ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন (জেপিএসসি) শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের কোনো যথাযথ বা স্থায়ী সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের সামনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের কাছে পেশ করা দাবিগুলো পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি তাঁর অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। তাঁর মতে, ঝাড়খণ্ড সরকার এবং কমিশনের বর্তমান উদাসীন মনোভাব রাজ্যজুড়ে লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। এই মনোবল অটুট রাখতে এবং সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করতে তিনি অনশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য হলো ১৪তম পিটি পরীক্ষা বাতিল করা এবং টিডিপিএল (TDPL) নামক সংস্থার পরিচালিত সমস্ত পরীক্ষার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই লড়াই ততক্ষণ চলবে যতক্ষণ না সরকার নতজানু হয় এবং সব দোষীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।
আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে বারবার চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তাই একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। জেপিএসসি নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে গত নয় দিন ধরে রাঁচিতে লাগাতার বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন পরীক্ষার্থীরা। রোববার এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা একটি বিশাল মশাল মিছিল বের করেন। আন্দোলনকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে ঝাড়খণ্ডের ২৪টি জেলাজুড়ে এক বৃহত্তর গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তাঁদের প্রধান দাবি, বিতর্কিত জেপিএসসি পরীক্ষা বাতিল করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই-এর মাধ্যমে এর নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা হোক।
অন্যদিকে, এই পুরো ঘটনায় তদন্ত চালিয়ে ঝাড়খণ্ড সিআইডি ইতোমধ্যে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে সিআইডির এই পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা। তাঁদের স্পষ্ট কথা, তদন্ত চলবে, তবে তার পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনও অব্যাহত থাকবে। রাঁচিতে টানা নয় দিন ধরে চলা অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ঘোষণা করেন যে, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের এই লড়াইয়ে ককরোচ জনতা পার্টি সম্পূর্ণভাবে পাশে আছে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় অভিজিৎ দীপকে জানান, ঝাড়খণ্ডে জেপিএসসি ও জেএসএসসি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো সম্পূর্ণ ন্যায্য এবং সিজেপি এই লড়াইয়ে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকের কাছে সহযোগিতার আকুল আবেদন জানাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, দিল্লির জন্তর মন্তরে আন্দোলনের সময় সিজেপি যেভাবে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, ঝাড়খণ্ডের এই সংকটেও তারা সংগঠনটির কাছ থেকে একই ধরনের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন। 이에 অভিজিৎ দীপকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে যে ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে, তা নিঃসংকোচে প্রদান করা হবে এবং শিক্ষার্থীদের সব দাবি সংশ্লিষ্ট উচ্চমহলে জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে।











