সাধারণত নির্বাচনের বছরগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর তহবিলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টির (জাপা) ক্ষেত্রে দেখা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে দলটির আয়ে বড় ধরনের পতন ঘটেছে, যেখানে আয় কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশের বেশি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমলেও নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা কারণে দলটির ব্যয় উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে। রবিবার (২৬ জুলাই) নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া ২০২৫ পঞ্জিকা বছরের অডিট রিপোর্টে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
জাতীয় পার্টির অতিরিক্ত মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়ার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে গিয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদের কাছে দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের স্বাক্ষরিত এই নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেন। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে জাতীয় পার্টির মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৮২ লাখ ৪,২৭০ টাকা। এর ঠিক আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে দলটির আয় ছিল ২ কোটি ৬৪ লাখ ৩৮,৯৩৮ টাকা। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জাপার মোট আয় কমেছে প্রায় ৪৫ দশমিক ২১ শতাংশ।
আয়ের এই ব্যাপক পতনের বিপরীতে দলটির ব্যয়ের খাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৫ সালে জাতীয় পার্টির মোট ব্যয়ের পরিমাণ হয়েছে ১ কোটি ৮৭ লাখ ৯৩,৪৩৩ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে জাপার মোট ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৭৯ লাখ ৮৮,০৪৪ টাকা। আর্থিক অবস্থার এই পরিবর্তনের ফলে দলটির ব্যাংক ব্যালেন্সেও প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে দলটির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রয়েছে ৭৮ লাখ ৬১,৭৩১ টাকা, যেখানে আগের বছর এই পরিমাণ ছিল ৮৪ লাখ ৫০,৮৯৪ টাকা।
অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর নির্বাচন ভবনে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন জাপার অতিরিক্ত মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া। আয় কমে ব্যয় বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “এ বছর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ফলে আমাদের খরচ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।” তিনি আরও জানান, জাতীয় সংসদের মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৯২টিতে প্রার্থী দিয়েছিল জাতীয় পার্টি। এই নির্বাচন উপলক্ষে দলগতভাবে তাদের মোট ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, “এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগতভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও আমাদের সমর্থিত প্রার্থীরা নিজ নিজ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অংশ নেবেন এবং দল তাদের পূর্ণ সমর্থন প্রদান করবে।”
সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিচার ও গ্রেপ্তারের দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জাপা নেতা বলেন, “তিনি অসুস্থতাজনিত কারণেই পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে থাকাকালীন তিনি সংবিধানবিরোধী কোনো কাজ করেছেন কি না, সেটিই এখন মূল দেখার বিষয়। যদি তেমন কোনো প্রমাণ না থাকে, তবে আমরা কেন তার গ্রেপ্তারের দাবি তুলব? এই বিষয়ে জাতীয় পার্টির আলাদা কোনো মন্তব্য নেই।”
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর জাপার ভেতরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নতুন করে ভাঙন ধরার গুঞ্জন প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, “যারা দল ছেড়ে গিয়েছিলেন, তাদের অধিকাংশই এখন জি এম কাদেরের নেতৃত্বে পুনরায় ফিরে এসেছেন। দলটির তৃণমূল পর্যায়ে এই ভাঙনের কোনো প্রভাব পড়েনি এবং আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আগামী নির্বাচনে দল হিসেবে আমরা অত্যন্ত ভালো ফল করব।”
অডিট রিপোর্ট জমাদানকালে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মো. খলিলুর রহমান খলিল, যুগ্ম মহাসচিব এ বি এম লিয়াকত হোসেন চাকলাদার, দপ্তর সম্পাদক মাহমুদ আলম এবং নির্বাহী সদস্য বহ্নি বেপারীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৫৯টি। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, প্রতি বছর ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিবন্ধিত দলগুলোকে তাদের পূর্ববর্তী পঞ্জিকা বছরের নিরীক্ষিত হিসাব বিবরণী জমা দিতে হয়। যদি কোনো দল টানা তিন বছর এই প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই দলের নিবন্ধন বাতিলের পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।











