প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ছয় মাসের আল্টিমেটাম এবং তার বিপরীতে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে এখন উত্তপ্ত দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আলোচনা। জ্বালানি সংকট নিরসনে বিরোধী দলের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, তখন সেই চ্যালেঞ্জ সরাসরি গ্রহণ করে সমাধানের পথ দেখিয়েছেন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। শনিবার (১৫ আগস্ট) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক বিস্তারিত পোস্টের মাধ্যমে তিনি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণের ঘোষণা দেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বনানীতে টিঅ্যান্ডটি কলোনি মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে আর্থিক সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের জ্বালানি সংকট সমাধানে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। তিনি স্পষ্টভাবে আহ্বান জানান যে, বিরোধী দলগুলো যদি জ্বালানি সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান দিতে পারে, তবে তা সরকারের কাছে পেশ করতে পারে। এই প্রেক্ষিতে তিনি ছয় মাসের একটি আল্টিমেটাম বা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের পরিকল্পনা যদি আগামী ছয় মাসের মধ্যে জ্বালানি সমস্যার বাস্তব সমাধান দিতে সক্ষম হয়, তবে সরকার সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই চ্যালেঞ্জের সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা প্রদানের জন্য ছয় মাসের আল্টিমেটাম দিয়ে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। আমরা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম এবং সেই সাথে সমাধান পরিকল্পনা প্রস্তাব করছি।’ তিনি ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেন যে, চ্যালেঞ্জ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর জানা প্রয়োজন ছিল যে সমাধানের পথ ইতিমধ্যেই সরকারের টেবিলে বিদ্যমান।
হাসনাত আব্দুল্লাহর দাবি অনুযায়ী, এনসিপির আহ্বায়ক, সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ইতিমধ্যেই স্বল্পমেয়াদী (৩০ দিন), মধ্যমেয়াদী (৬–১৮ মাস) এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মোট ১৫ দফার একটি সুনির্দিষ্ট সমাধান প্রস্তাবনা পেশ করেছেন। তিনি তার পোস্টে বিস্তারিত দেখিয়েছেন যে, কোন সিদ্ধান্তটি কোথায় ভুল হয়েছে এবং কীভাবে তা সংশোধন করা সম্ভব। বিশেষ করে ভর্তুকি নীতি, ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান এবং ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান নিয়ে বিরোধী দলীয় সদস্যরা সুস্পষ্ট ও সমাধানধর্মী বক্তব্য রেখেছেন। কেবল রাজনৈতিক দল নয়, বরং নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেও মূল্যবান মতামত এসেছে, যা জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে এবং বিভিন্ন সেমিনারে আলোচিত হয়েছে।
সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাসনাত আব্দুল্লাহ লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ডাউস সাইজের মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পরিষদ থাকা সত্ত্বেও এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো তার কাছে পৌঁছায়নি, এটি অত্যন্ত লজ্জার কথা।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী মিলিয়ে সরকারের মোট সদস্য সংখ্যা ৬২ জন। অথচ এই বিশাল দলের একজনও নাগরিক মতামত বা বিরোধী দলের গঠনমূলক প্রস্তাবনাগুলো পড়ার প্রয়োজন মনে করেননি। একে তিনি গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিহাসে এক অত্যন্ত খারাপ উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেন। তার মতে, এটি এখন আর কেবল নীতির প্রশ্ন নয়, বরং বর্তমান টিমের সক্ষমতা ও যোগ্যতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, এনসিপির দেওয়া ৩০ দিনের জন্য ৫টি, মধ্যমেয়াদী (৬-১৮ মাস) ৬টি এবং দীর্ঘমেয়াদে ৪টি সুস্পষ্ট সমাধান প্রস্তাবনাটি অনুগ্রহ করে পড়ে দেখার জন্য। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিশেষ সংসদীয় অধিবেশন ডাকার অনুরোধে সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানান। সরকারের এই উদাসীনতাকে তিনি অত্যন্ত হতাশার চোখে দেখছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশাল টিমের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রশাসনিক ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে এই সংসদ সদস্য আরও লেখেন, গত ছয় মাসে প্রশাসনে যে হারে দলীয় পদায়ন করা হয়েছে, তাতে ‘ইনস্টিটিউশনাল মেমরি’ বা প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। এর ফলে ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান কিংবা ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যানের মতো মৌলিক বিষয়গুলো এখন অনুপস্থিত। তিনি অভিযোগ করেন, যে খাত থেকে বিদ্যুৎ আসে সেখান থেকেই ভর্তুকি কাটা হয়েছে, অথচ ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি অক্ষত রাখা হয়েছে। সচিবালয়ে আসা নতুন ও অনভিজ্ঞ কর্মকর্তারা লবি গ্রুপের পরামর্শে কাজ করছেন বলে তিনি দাবি করেন। মহেশখালীর FSRU-তে অগ্নিকাণ্ডের পর রক্ষণাবেক্ষণে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, সেই স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনটি আজও প্রকাশিত হয়নি, যা সরকারের অস্বচ্ছতার প্রমাণ বলে তিনি মনে করেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহ তার পোস্টে একটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, সরকার ডলার সংকট এবং বকেয়ার অজুহাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কেনা যাচ্ছে না বলে দাবি করছে, যার ফলে দেশের অধিকাংশ ভারী শিল্প বন্ধ হয়ে পড়েছিল। এই পরিস্থিতিতে তিনি প্রশ্ন তোলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুমোদিত ‘মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫’ এখনো কেন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না? এই কাঠামোর আওতায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা সরাসরি বড় শিল্প গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে। এক্ষেত্রে দর দুই পক্ষ নিজেদের মধ্যে ঠিক করে এবং বিইআরসি কেবল অবহিত থাকে, আর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে চলে যায়। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এক টাকাও খরচ হয় না। তিনি উল্লেখ করেন, বাকি কাজ কেবল SLA ফরম্যাট এবং হুইলিং চার্জ চূড়ান্ত করা, যা কয়েক সপ্তাহের সাধারণ প্রশাসনিক কাজ এবং কোনো ‘রকেট সায়েন্স’ নয়।
পরিশেষে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, সমাধান ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সরকার তা পড়ার প্রয়োজন মনে করেনি। তবে ছয় মাসের হিসাবটি তিনি মেনে নিয়েছেন। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এখন ঘড়িটি বিরোধী দলের নয়, বরং সরকারের হাতে। মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাস্তবায়নে যদি ছয় মাসের বেশি সময় লাগে, তবে তা আর নীতির প্রশ্ন থাকবে না, বরং তা হবে সরকারের সক্ষমতার ব্যর্থতার চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি। তিনি বলেন, অযোগ্য লোক দিয়ে কৌশলগত খাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বলা যায় না, বরং এটি ‘আই হ্যাভ নো প্ল্যান’-এর একটি পরীক্ষা মাত্র। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে আল্টিমেটাম দেন না, বরং সরকারই তার কাজের জবাবদিহি করে। হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রশ্ন তোলেন, সরকার ছয় মাস ক্ষমতায় থাকার পর দেশ কেন ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ল এবং রাষ্ট্র কেন অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো। তার দাবি, সমাধান তাদের হাতে থাকলেও ক্ষমতা সরকারের হাতে। ছয় মাস পর জনগণ বিচার করবে, সমাধান না থাকার কারণে নাকি সক্ষমতার অভাবে দেশ অন্ধকারে ছিল।







