গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার তার পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদ দায়িত্ব পালন করবে—রাজনীতির ক্ষেত্রে এই মৌলিক বিষয়টি মেনে চলাই শ্রেয় বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, সরকারের কোনো নির্দিষ্ট ব্যর্থতা থাকলে সেই বিষয়ে চাপ তৈরি করা কার্যকর হতে পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করা সমাধান নয়। একইসঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ককটেল বিস্ফোরণ বা বাসে আগুন দেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে সংকট তৈরি করার চেষ্টা করা যাবে না।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্তাবলীর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তথ্য উপদেষ্টা জানান, জ্বালানি ভর্তুকির সঙ্গে আইএমএফ থেকে ঋণ পাওয়ার সরাসরি কোনো শর্ত নেই। তবে তিনি ব্যাখ্যা করেন, আইএমএফ-এর একটি সাধারণ নীতি বা বেসিক নিয়ম রয়েছে যে, তারা কোনো সরকারের পক্ষেই অত্যধিক ভর্তুকি দেওয়ার পক্ষে থাকে না। তিনি বলেন, ‘আমরা আইএমএফ-এর এই সাধারণ নিয়মগুলো মেনে চলছি, তবে বিষয়টি কেবল শর্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। এমনকি আমাদের কিছু কার্ড প্রজেক্ট বা বিশেষ প্রকল্প রয়েছে যেগুলোর ব্যাপারে তারা খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না, কিন্তু আমরা জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করে সেগুলো বাস্তবায়ন করছি। তাই এই দুটি বিষয়ের মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।’

জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘যদি আমরা তরল জ্বালানির সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকিকে যোগ করি, তবে দেখা যাবে এটি একটি বিশাল অংকের অর্থ। অর্থনীতির সাধারণ জ্ঞান দিয়ে আমরা বুঝতে পারি যে, এই বিশাল ভর্তুকি কমিয়ে আনা প্রয়োজন। এখন আমরা সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি যে, কোন খাতে কতটুকু কমানো যেতে পারে এবং তা কীভাবে করা হবে।’

জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে রাজনৈতিক সমালোচনার প্রেক্ষিতে উপদেষ্টা এক ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি যদি এই মুহূর্তে সরকারের উপদেষ্টা না থেকে একজন অ্যাক্টিভিস্ট বা কর্মী হতাম, তবে নিশ্চিতভাবেই আমি এর প্রতিবাদ জানাতাম। এমনকি শেখ হাসিনার সময় হলে আমি কেবল প্রতিবাদই করতাম না, বরং সরকারের পদত্যাগও দাবি করতাম। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা করা যাবে না এবং করা উচিতও হবে না।’

এর পেছনে যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘হাসিনার আমলে যখনই সংকটের সৃষ্টি হতো, যেমন পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকায় পৌঁছে যেত, তখন আমরা পদত্যাগের দাবি জানাতাম। কারণ সেই সরকারকে আমরা আমাদের মনেপ্রাণে গ্রহণ করিনি; সেটি একটি বৈধ বা লেজিটিমেট সরকার ছিল না। তাই আমরা তাদের কোনো যুক্তি শুনতে প্রস্তুত ছিলাম না এবং পদত্যাগই একমাত্র পথ মনে করতাম।’

বর্তমান সরকারের বৈধতা এবং জনগণের মালিকানার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এই সরকার আমাদের সরকার। হতে পারে আমাদের মধ্যে অনেকে এই নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিইনি, কিন্তু আমরা সবাই নির্বাচনের প্রক্রিয়ার অংশ ছিলাম, অংশগ্রহণ করেছি এবং কেউ কেউ পরাজিত হয়েছি। একইভাবে ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনে আমরা পরাজিত হলেও, যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাকেও আমরা আমাদের সরকার হিসেবেই গ্রহণ করব এবং মালিকানা দেব।’

অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেকোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা হওয়া স্বাভাবিক। কোন সিদ্ধান্তটি আরও ভালোভাবে নেওয়া যেত বা ব্যয় আরও কমানো যেত কি না—এই ধরণের গঠনমূলক সমালোচনা প্রত্যেকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আসতে পারে এবং সরকার তা বিবেচনা করবে।

এদিকে তেল, গ্যাস ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলোর একদফা আন্দোলনের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা দেখছি একদফা দাবি তোলা হচ্ছে। তবে মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করবে—এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে রাজনীতি করা উচিত।’

এই প্রসঙ্গে তিনি ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে বলেন, ‘ভারতে আমরা দেখেছি ককরোচ জনতা পার্টি বা কৃষকদের বিশাল আন্দোলন হয়েছিল, এমনকি দিল্লি শহর পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই বিশাল আন্দোলনের মধ্যেও সরকারের পদত্যাগের দাবি তোলা হয়নি। ব্যর্থতার নির্দিষ্ট জায়গায় চাপ তৈরি করা অনেক বেশি কার্যকর ও শ্রেয় পদ্ধতি।’

সবশেষে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণ এবং বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বা নির্দিষ্ট কোনো দলের কথা বলছি না, তবে ঢাকা শহরের কিছু জায়গায় ককটেল ফাটিয়ে বা বাসে আগুন দিয়ে সরকারের মধ্যে কোনো সংকট তৈরি করা যাবে বলে আমি মনে করি না। এই ধরণের কর্মকাণ্ড কোনো সমাধান বয়ে আনবে না।’