ডিমকে বলা হয় সাশ্রয়ী অথচ অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার। শিশু থেকে প্রবীণ, প্রায় সব বয়সীদের খাদ্যতালিকায় ডিম রাখার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা। তবে উপকারিতা নিয়ে কারও সন্দেহ না থাকলেও ডিম খাওয়া নিয়ে সমাজে নানা প্রশ্ন ও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। প্রতিদিন কয়টি ডিম খাওয়া নিরাপদ, ডিম খেলে রক্তে কোলেস্টেরল বাড়ে কি না, কুসুম হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় কি না, কাঁচা ডিম খাওয়া উচিত কি না, ব্রয়লার না দেশি ডিম ভালো—এমন অনেক সংশয় মানুষের মনে কাজ করে। এসব প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ডা. অরুণ কুমার।
ডিমে কী কী পুষ্টি উপাদান রয়েছে, সে বিষয়ে ডা. অরুণ কুমার বলেন, একটি মাঝারি আকারের ডিমে প্রায় ৬০ ক্যালরি শক্তি এবং প্রায় ৬ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন থাকে। ডিমের প্রোটিনকে উচ্চমানের বলার কারণ হলো মানব শরীর এটি খুব সহজে হজম, শোষণ ও ব্যবহার করতে পারে। অন্যান্য খাবারের প্রোটিনের কার্যকারিতা পরিমাপের সময় ডিমের প্রোটিনকেই আদর্শ ধরা হয়। এ কারণে পুষ্টিবিজ্ঞানে ডিমের প্রোটিনকে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড বা উৎকৃষ্ট মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শরীরের কোষ গঠন, পেশি মজবুত রাখা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এই প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অনেকের ধারণা, ডিমের সাদা অংশ উপকারী হলেও কুসুম শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে কুসুমে থাকা কোলেস্টেরল নিয়ে ভয় বেশি। তবে বিশেষজ্ঞের মতে এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। ডিমের সাদা অংশের পাশাপাশি কুসুমেও যথেষ্ট পরিমাণে প্রোটিন রয়েছে। কুসুমে কোলিন নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান থাকে, যা স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। গর্ভবতী নারীর সুস্থতা এবং গর্ভের শিশুর মস্তিষ্ক ও শরীরের সঠিক বিকাশের জন্যও কোলিন অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া ডিমের কুসুমে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন নামে প্রাকৃতিক রঞ্জক ও শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে। ডিম থেকে ভিটামিন ডি, ফোলেট, আয়োডিন ও বি ভিটামিনসহ আরও নানা প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।
দিনে কয়টি ডিম খাওয়া যাবে, তা ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ও পরিশ্রমের মাত্রার ওপর নির্ভর করে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ হলো, শিশুদের প্রতিদিন একটি থেকে দুটি ডিম দেওয়া যেতে পারে। গর্ভবতী নারীরা সর্বোচ্চ দুটি ডিম খেতে পারেন। বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্যও প্রতিদিন প্রায় দুটি ডিম উপকারী হতে পারে। আর যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা যাদের বেশি প্রোটিনের প্রয়োজন হয়, তারা দিনে তিন থেকে চারটি পর্যন্ত ডিম খেতে পারেন। তবে সাধারণভাবে অধিকাংশ সুস্থ মানুষ প্রতিদিন একটি থেকে দুটি ডিম নিরাপদে খেতে পারেন। এখানে পুরো ডিম অর্থাৎ কুসুমসহ ডিমের কথাই বলা হচ্ছে।
ডিমের কুসুম নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কোলেস্টেরলকে ঘিরে। একটি ডিমের কুসুমে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে। তবে খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল আর রক্তে থাকা কোলেস্টেরল এক বিষয় নয় বলে স্পষ্ট করেছেন ডা. অরুণ কুমার। তিনি বলেন, শরীরের প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরলের একটি বড় অংশ যকৃত নিজেই তৈরি করে। খাবারের মাধ্যমে কোলেস্টেরল গ্রহণ বাড়লে যকৃত নিজে থেকে তার উৎপাদন কমিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ দিনে দুটি ডিম খেলে খাবার থেকে প্রায় ৪০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে শরীর প্রয়োজন অনুযায়ী যকৃতে কোলেস্টেরল তৈরির পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে। শুধু ডিম নয়, দুধ, দুগ্ধজাত খাবার ও মাংসেও কোলেস্টেরল থাকে। রক্তে অতিরিক্ত এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল থাকলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এলডিএলের মাত্রা বেশি হলে ধমনিতে প্লাক জমে রক্ত চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। এর ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের আশঙ্কা বাড়ে। তবে ডিম খাওয়ার মাধ্যমে শরীরে যে কোলেস্টেরল প্রবেশ করে, তা সাধারণভাবে রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব বেশি বাড়ায় না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ।
তবে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ফ্যামিলিয়াল হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়া নামে একটি বিরল জিনগত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। এই রোগে আক্রান্তদের শরীরে কোলেস্টেরল প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা কম থাকায় রক্তে এলডিএলের মাত্রা অনেক বেড়ে যেতে পারে। এমন ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডিমের কুসুম কমিয়ে দেওয়া বা পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে হতে পারে। ডা. অরুণ কুমারের মতে, এছাড়া অধিকাংশ মানুষ পরিমিত পরিমাণে ডিমের কুসুম খেতে পারেন। ডিমের কুসুম খেলে জন্ডিস হয় বা কিডনির ক্ষতি হয় বলে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে, তাকেও তিনি ভুল ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।
ডিম কেনার সময় অনেকেই দ্বিধায় পড়েন, উন্মুক্ত পরিবেশে পালন করা মুরগির ডিম ভালো নাকি খামারে পালন করা মুরগির ডিম ভালো। ডা. অরুণ কুমারের মতে, দুই ধরনের ডিমেই প্রায় একই পরিমাণ প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে। উন্মুক্ত পরিবেশে পালন করা মুরগি ঘাস, পোকামাকড়সহ প্রাকৃতিক খাবার খেলে তাদের ডিমে ক্যারোটিনয়েডের পরিমাণ কিছুটা বেশি হতে পারে। এ কারণে এসব ডিমের কুসুম তুলনামূলক গাঢ় হলুদ বা কমলা রঙের দেখায়। প্রাকৃতিক খাবারের কারণে কিছু ক্ষেত্রে এসব ডিমে ওমেগা-৩ এর পরিমাণও সামান্য বেশি থাকতে পারে। তবে এই পার্থক্য খুব বেশি নয়। শুধু প্রোটিনের জন্য ডিম খেলে খামারে উৎপাদিত ডিম খেতে কোনো ক্ষতি নেই। তাই কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়ে উন্মুক্ত পরিবেশে পালন করা মুরগির ডিম কেনার প্রয়োজন নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মুরগিকে দ্রুত বড় করার জন্য হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয় বলে একটি ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে। তবে বিশেষজ্ঞের মতে এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। মুরগি পালনে হরমোন ব্যবহার করা বাস্তবসম্মত নয় এবং এর খরচও অত্যন্ত বেশি। মুরগির রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়। অনেকে সেই টিকাকেই ভুল করে হরমোন ইনজেকশন মনে করেন। ডিম বা মুরগির মাংস খাওয়ার কারণে মেয়েদের বয়ঃসন্ধি অস্বাভাবিকভাবে আগে শুরু হয়, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণও নেই বলে জানিয়েছেন ডা. অরুণ কুমার।
ডিম খেলে গ্যাস বা পেটে অস্বস্তি হয় বলে অনেকে অভিযোগ করেন। তবে বিশেষজ্ঞের মতে এটি সবার ক্ষেত্রে সত্য নয়। ডিমের কুসুম খাওয়ার পর কারও কারও শুরুতে সামান্য অস্বস্তি হতে পারে। নিয়মিত ডিম খাওয়ার সঙ্গে শরীর অভ্যস্ত হয়ে গেলে অনেকের ক্ষেত্রে এই সমস্যা ধীরে ধীরে কমে যায়। কাঁচা ডিম খাওয়া এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ কাঁচা ডিমে সালমোনেলা নামের ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা ডায়রিয়া ও অন্যান্য গুরুতর পেটের সমস্যা তৈরি করতে পারে। এছাড়া কাঁচা ডিমে থাকা অ্যাভিডিন নামের একটি প্রোটিন শরীরে বায়োটিন শোষণে বাধা দিতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত কাঁচা ডিম খেলে এ কারণে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কাঁচা ডিমের বদলে রান্না করে ডিম খাওয়াই নিরাপদ। সেদ্ধ, হাফ বয়েল বা ভাজা ডিমের মধ্যে পুষ্টিগুণের বড় কোনো পার্থক্য নেই বলে জানিয়েছেন ডা. অরুণ কুমার। অতিরিক্ত ওজন বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে ডিম রাখতে পারেন। সূত্র: বিবিসি বাংলা





















